শিক্ষক আছেন, বিদ্যালয় আছে, শ্রেণিকক্ষও আছে—কিন্তু মানসম্মত পাঠদান নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায়। ২০২৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় উপজেলায় পাসের হার মাত্র ৩৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অন্যদিকে সরকারি প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় উপজেলার ১০৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কোনো শিক্ষার্থী বৃত্তি না পাওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। শিক্ষার এমন চিত্রে অভিভাবক ও সচেতন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য, নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান না করা, ক্লাস ফাঁকি, শিক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যে গ্রুপিং এবং বিভিন্ন সংগঠনের পদ-পদবি ব্যবহার করে শ্রেণিকক্ষের বাইরে সময় কাটানোর প্রবণতায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ। এতে একদিকে যেমন শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি অভিভাবকদের আস্থাও কমছে।
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় বাহুবল উপজেলায় পাসের হার ৩৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রতি ১০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৬৫ জনই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। অতীতের ফলাফলের তুলনায়ও এ হার কম বলে জানা গেছে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে এমন ফলাফল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং শিক্ষা প্রশাসনের তদারকি নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
কেন বাহুবলের শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত ফলাফল করতে পারছে না, কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল সবচেয়ে খারাপ এবং এর পেছনে কী কী কারণ রয়েছে—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি বড় উদাহরণ সরকারি প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফলাফল। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাহুবল উপজেলার ১০৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কোনো শিক্ষার্থী বৃত্তি পায়নি। প্রাথমিক পর্যায়েই শিক্ষার্থীদের এমন ফলাফল পরবর্তী শিক্ষাজীবনে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
তবে বৃত্তি পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে সব শিক্ষার্থীর সামগ্রিক শিক্ষার মান নির্ধারণ করা যায় না। তারপরও উপজেলার এতগুলো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কোনো শিক্ষার্থী বৃত্তি না পাওয়ার বিষয়টি শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের অভিযোগ, উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিছু শিক্ষক নিয়মিত পাঠদানের চেয়ে ব্যক্তিগত কোচিং, প্রাইভেট পড়ানো, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন দপ্তরে তদবির নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন। বিশেষ করে শিক্ষক সংগঠনের বিভিন্ন পদে থাকা কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ে পাঠদানের নির্ধারিত সময় থাকলেও কিছু শিক্ষককে প্রায়ই শ্রেণিকক্ষের বাইরে দেখা যায়। কেউ ব্যক্তিগত কাজে, কেউ সংগঠনের সভা-সমাবেশে, আবার কেউ উপজেলা প্রশাসন ও শিক্ষা অফিসে বিভিন্ন তদবির নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। ফলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ অভিভাবকদের।
শিক্ষক সংগঠনগুলো শিক্ষকদের পেশাগত অধিকার রক্ষা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখার কথা থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে এসব সংগঠনকে কেন্দ্র করে গ্রুপিং ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষকতার মূল দায়িত্বের চেয়ে সাংগঠনিক পরিচয় ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কি না।
এদিকে কোচিং বাণিজ্য নিয়েও অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যথাযথ পাঠদান না করে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব কোচিং বা প্রাইভেট পড়তে উৎসাহিত করেন। এতে দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা বাড়তি আর্থিক চাপের মুখে পড়ছে। শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত কোচিংনির্ভরতা অনেকাংশে কমে আসত বলে মনে করছেন অভিভাবকরা।
শিক্ষার মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে না থাকায় সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি অভিভাবকদের আস্থা কমছে বলে স্থানীয়দের দাবি। অনেক অভিভাবক সন্তানদের সরকারি বিদ্যালয় থেকে ছাড়িয়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাচ্ছেন। এতে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীসংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিভাবকদের মতে, একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার নিয়মিত পাঠদান, শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জন এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি নিশ্চিত করা শিক্ষকদের দায়িত্ব। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে যথাযথ পাঠদান না হলে শিক্ষার্থীদের কোচিংনির্ভরতা বাড়ে এবং পরিবারের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়।
জাহানারা আক্তার নামে একজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারি স্কুলে সন্তানদের ভর্তি করিয়েছি ভালো শিক্ষার আশায়। কিন্তু অনেক সময় স্কুলে গিয়ে দেখি ঠিকমতো ক্লাস হচ্ছে না। শিক্ষকদের কেউ কেউ ক্লাসের চেয়ে ব্যক্তিগত কোচিং ও অন্যান্য কাজে বেশি ব্যস্ত থাকেন। তাহলে সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বাধ্য হয়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে।”
আরেক অভিভাবক রফিক মিয়া বলেন, “শিক্ষকরা যদি নিয়মিত ক্লাস না নেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা কীভাবে ভালো ফলাফল করবে? স্কুলে পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত না হলে অভিভাবকদের আস্থা কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। আমরা চাই, শিক্ষা প্রশাসন নিয়মিত বিদ্যালয় পরিদর্শন করে শিক্ষকদের জবাবদিহির আওতায় আনুক।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নে শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি, নির্ধারিত সময়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, পাঠ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মূল্যায়ন এবং বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির কার্যকর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব বিষয়ে যথাযথ তদারকি না থাকলে শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা কঠিন।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, বাহুবল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম কতটা তদারকি করছে? শিক্ষকদের উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময়সূচি, কোচিং বাণিজ্য এবং সংগঠনের নামে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগগুলো কতটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে? ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় এত কম পাসের হার এবং প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী বৃত্তি না পাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আকস্মিক পরিদর্শন, শিক্ষকদের হাজিরা খাতা ও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের তথ্য যাচাই, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং বিগত কয়েক বছরের পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকরা।
এ বিষয়ে জানতে বাহুবল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উজ্জ্বল রায় বলেন, “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদানের পরিবেশ বজায় রাখা এবং শিক্ষকদের নিয়মিত দায়িত্ব পালনের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখি। কোনো শিক্ষক দায়িত্বে অবহেলা করলে বা নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অভিভাবক ও সচেতন মহলের দাবি, বাহুবলের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র নিরূপণে শিক্ষা প্রশাসনকে কার্যকর তদন্ত করতে হবে। শিক্ষকদের উপস্থিতি ও পাঠদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল পর্যালোচনা করে দুর্বলতা চিহ্নিত করতে হবে। সংগঠনের নেতৃত্ব কিংবা ব্যক্তিগত ব্যস্ততার চেয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
অন্যথায় শিক্ষক সংকট নয়, বরং দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির অভাবেই বাহুবলের সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থী হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। আগামী প্রজন্মের শিক্ষার ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









