শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস জেলা শহরের কাছাকাছি স্থাপনের দাবিতে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে এসেছে জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্ধারণের দাবিতে সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব মোর্শেদ টিপু মাদবরের নেতৃত্বে দলটির একটি অংশ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে জাতীয় সংসদের হুইপ ও শরীয়তপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপুকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে টিপুর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে জেলা যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের একাংশের নেতাকর্মীরা। তাঁরা টিপুকে দল থেকে বহিষ্কার ও গ্রেপ্তারের দাবিও জানিয়েছেন। এ নিয়ে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও কর্মসূচি দেখা দিয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে শরীয়তপুরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই বছরের অক্টোবরে সরকার বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে বিশ্ববিদ্যালয়টির নামকরণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠার আইন চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। একই বছরের ১৩ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়টির গেজেট প্রকাশিত হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রাখে। চলতি বছরের ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. হোসেন উদ্দিন শেখরকে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের স্থান নির্ধারণ নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয় গত ১৬ অক্টোবর। ওই দিন জাতীয় সংসদের হুইপ ও শরীয়তপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও জেলা প্রশাসককে সঙ্গে নিয়ে ডামুড্যা উপজেলার পূর্ব ডামুড্যা এলাকায় একটি জমি পরিদর্শন করেন। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস স্থাপনের কথা জানানো হয়। প্রস্তাবিত এলাকাটি জেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। এরপর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়টি জেলা শহরের কাছাকাছি, বিশেষ করে ঢাকা-শরীয়তপুর মহাসড়কের পাশে স্থাপনের দাবিতে আন্দোলনে নামেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
গত ২৩ অক্টোবর কোটাপাড়া সেতুসংলগ্ন ঢাকা-শরীয়তপুর মহাসড়কে মানববন্ধনের মধ্য দিয়ে এ আন্দোলন শুরু হয়। ২৮ অক্টোবর সদর উপজেলা পরিষদের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন আন্দোলনকারীরা। মিছিলটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়। পরে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়। কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব মোর্শেদ টিপু মাদবর। তাঁর সঙ্গে জেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম লিটন মুন্সিসহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। সদর, জাজিরা ও নড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকার কয়েক হাজার মানুষ ওই কর্মসূচিতে যোগ দেন বলে আয়োজকদের দাবি।
এরপর ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় একই দাবিতে মানববন্ধন, মশাল মিছিল ও প্রায় ৩০ মিনিট সড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা। সর্বশেষ ২ নভেম্বর সন্ধ্যায় সদর উপজেলার পালং, তুলাসার ও ডোমসার ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। এসব কর্মসূচিতে টিপু মাদবরের পাশাপাশি বিএনপি নেতা লিটন মুন্সী ও সরদার একেএম চানমিয়া নেতৃত্ব দেন।
তবে ২৮ অক্টোবরের আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই বিএনপির দুই পক্ষের বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ওই কর্মসূচির পর সাবেক ছাত্রদল নেতা মিজানের সঙ্গে টেলিফোনে কথোপকথনের সময় হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপুকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন টিপু মাদবর। কথোপকথনের ওই অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিএনপির অন্য একটি অংশের নেতাকর্মীরা তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হন। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন টিপু।
এ অভিযোগে ১ নভেম্বর সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন জেলা যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের একাংশের নেতাকর্মীরা। মিছিলে নেতৃত্ব দেন জেলা যুবদলের সভাপতি জামাল উদ্দিন বিদ্যুৎ, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি জাকির হাওলাদার ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমানুল্লাহ আমান। পরে তারা টিপু মাদবরকে দল থেকে বহিষ্কার ও গ্রেপ্তারের দাবিতে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সরদার নাসির উদ্দিন কালুর কাছে স্মারকলিপি দেন। এ সময় বিষয়টি দলের ঊর্ধ্বতন নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে মাহাবুব মোর্শেদ টিপু মাদবর বলেন, আন্দোলন বা বিক্ষোভ কর্মসূচি চলাকালে তিনি হুইপকে নিয়ে কোনো ধরনের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেননি। মিজান নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর আগে থেকেই বিরোধ রয়েছে। ওই ব্যক্তি তাঁর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন লেখালেখি করায় তিনি ফোনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং গালিগালাজ করেন। কথোপকথনে ভুলবশত কিছু বলে থাকলেও তা হুইপকে উদ্দেশ্য করে নয় বলে দাবি করেন তিনি।
টিপু বলেন, ‘আমি অপু ভাইকে সম্মান করি। তাঁর বিরুদ্ধে আমি কেন কথা বলব? আমি তর্ক করেছি মিজানের সঙ্গে। মূলত দলের একটি অংশ চায় না ঢাকা-শরীয়তপুর মহাসড়কের পাশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হোক। তারা হুইপ অপু মৃধা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটিকে সমর্থন করছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়টি শহরের কাছাকাছি স্থাপনের দাবি জানানোর অধিকার আমার আছে। আমি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছি। এটা কি আমার অপরাধ?’
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্ধারণের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, জেলা শহরের কাছাকাছি ক্যাম্পাস হলে শিক্ষার্থীরা যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসনসহ বিভিন্ন সুবিধা পাবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের টিউশনি করে আয়ের সুযোগও থাকবে। তাঁর ভাষ্য, প্রস্তাবিত এলাকায় এসব সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলকভাবে কম। সরকারকে বিষয়টি তদন্ত করে তাঁদের দাবির যৌক্তিকতা বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে সরকারকে দেওয়া আল্টিমেটামের সময় শেষ হলে পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে বলেও জানান টিপু।
অন্যদিকে জেলা যুবদলের সভাপতি জামাল উদ্দিন বিদ্যুৎ বলেন, হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপুকে নিয়ে টিপুর কটূক্তিমূলক বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বক্তব্যটি শুনলেই এর ধরন বোঝা যাবে। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে তারা বিক্ষোভ করেছেন।
বিদ্যুৎ আরও বলেন, টিপু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলনের নামে বিভিন্ন উপজেলাকে বিভক্ত করার চেষ্টা করছেন। তার দাবি, একটি ফটোকার্ডে নড়িয়া, জাজিরা ও সদর উপজেলাকে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের কিছু লোক উসকানি দিয়ে শরীয়তপুরের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করছে এবং হুইপের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করতে ষড়যন্ত্র করছে। বিএনপির কিছু নেতাকর্মীও এতে জড়িয়ে পড়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে বিরোধের বিষয়ে জেলা বিএনপির সভাপতি ও শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান কিরণ বলেন, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্ধারণ নিয়ে যাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে, তাঁদের পাশাপাশি জেলার শিক্ষিত ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি মতামত নেওয়া হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
টিপু মাদবরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং তাঁকে বহিষ্কারের দাবিতে দেওয়া স্মারকলিপির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নির্দেশনা দিলে কিংবা বহিষ্কারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানালে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপুকে কটূক্তির অভিযোগের বিষয়ে জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হোসেন উদ্দিন শেখরের সঙ্গেও একাধিকবার তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। একারনে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









