চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুরে মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর সংযোগস্থলের ওপর ব্রিটিশ আমলে নির্মিত রেলসেতু দিয়ে প্রতিদিন জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। সেতুর প্রবেশমুখে সাধারণ মানুষের চলাচল নিষিদ্ধ করে সতর্কবার্তা ও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও তা পুরোপুরি উপেক্ষা করা হচ্ছে। রেললাইনের ওপর কাঠের পাটাতন বসিয়ে অবৈধভাবে তৈরি করা হয়েছে চলাচলের পথ। পাটাতনের বহু অংশ ভেঙে যাওয়ায় এবং বড় বড় ফাঁক তৈরি হওয়ায় প্রায় ৬৬ ফুট নিচে গভীর নদীর ওপর এই পারাপার যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ১২টি পিলারের ওপর প্রতিষ্ঠিত এই রেলসেতুটি রহনপুরের দুই ইউনিয়নের বাসিন্দাদের যাতায়াতের অন্যতম সংক্ষিপ্ত পথ। সেতুটি দিয়ে ভারত থেকে আসা মালবাহী ট্রেনসহ নিয়মিত রেল চলাচল অব্যাহত থাকলেও জনসাধারণের জন্য এটি ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেতুর প্রবেশমুখেই টানানো রয়েছে— ‘সাবধান, এই সেতুর ওপর দিয়ে জনসাধারণের চলাচল নিষেধ’ লেখা সাইনবোর্ড। কিন্তু এসব নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে স্থানীয়রা প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, সেতুটিতে থেমে নেই মানুষের চলাচল। কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ সাইকেলে, আবার কেউ সাইকেলে ভারী পণ্য বহন করে সেতু পার হচ্ছেন। এ সময় স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
সেতু পারাপারের সময় কথা হয় রহনপুর এবি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে। সে জানায়, তাদের বাবা-দাদারাও এই সেতু দিয়ে যাতায়াত করতেন। বিকল্প বেলি সেতু দিয়ে যাতায়াত করতে অতিরিক্ত সময় ও পথ ঘুরে যেতে হয় বিধায় বাধ্য হয়ে তারা এই সংক্ষিপ্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ পথটি ব্যবহার করে স্কুলে যাতায়াত করে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পুনর্ভবা নদীর পশ্চিম পাশে অবস্থিত আলীনগর ও বাঙ্গাবাড়ি ইউনিয়নের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার মানুষ দৈনন্দিন কেনাকাটা, চিকিৎসা ও নানা প্রয়োজনে রহনপুর বাজারের ওপর নির্ভরশীল। এলাকার বাসিন্দাদের যাতায়াতের জন্য একটি বেলি সেতু থাকলেও সেটি মূল বাজার থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত। ফলে ওই পথ দিয়ে যাতায়াতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হয়। বিশেষ করে প্রতি সোমবার রহনপুরের হাটের দিন বেলি সেতুতে প্রচণ্ড ভিড় থাকায় এবং ভোগান্তি এড়াতে মানুষ এই রেলসেতুকে বেছে নেন। হাটের দিনে অন্তত ১০ হাজার মানুষ এবং সাধারণ দিনেও শিক্ষার্থীসহ অন্তত তিন হাজার মানুষ এই সেতু দিয়ে যাতায়াত করেন।
আলীনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মুহম্মদ মাসুস জানান, দুই ইউনিয়নের বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াতের জন্য বেলি সেতুটি অপ্রতুল এবং মূল বাজার থেকে দূরবর্তী হওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পথ ব্যবহার করছেন।
রেলওয়ের পক্ষ থেকে বারবার বাধা দেওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় লোকজনের অনীহার বিষয়টি তুলে ধরে রহনপুর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশনমাস্টার মীর্জা কামরুল হক বলেন, "এই রুটে নিয়মিত ট্রেন চলাচল করে। রেলওয়ের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে এই সেতু দিয়ে চলাচলে নিরুৎসাহিত করা হলেও স্থানীয় মানুষ ও জনপ্রতিনিধিরা নিজ উদ্যোগে পাটাতন বসিয়ে নিয়েছেন এবং তা দিয়েই চলাচল করছেন।"
এ বিষয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ হোসেন মাসুম বলেন, "রহনপুরের এই রেলসেতু দিয়ে সাধারণ মানুষের পারাপার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ। এভাবে রেলসেতু পার হওয়া আত্মহত্যার শামিল। সেখানে দুর্ঘটনা ঘটলে এর দায়ভার কে নেবে? সাধারণ মানুষকে চলাচলে বাধা দিতে গেলে অনেক সময় রেলওয়ের কর্মীরা উল্টো স্থানীয়দের রোষানলে পড়েন এবং মারধরের শিকার হন। অনেকেই আবার দাবি করেন— নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁদের রয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের নিষেধ অমান্য করে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল কোনোভাবেই নিরাপদ নয়।"


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









