চা মানেই অনেকের কাছে তৃপ্তির ঢেকুর, আড্ডার সঙ্গী কিংবা দিনের শুরু। কিন্তু যে সবুজ চা বাগান থেকে এই চায়ের জোগান আসে, সেই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো নারী শ্রমিকের কঠোর পরিশ্রম ও বঞ্চনার গল্প। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চা বাগানে কাজ করা এসব নারীর জীবনে এখনও অনেক মৌলিক সুবিধা অধরাই রয়ে গেছে।
দেশের চা শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের অর্ধেকের বেশি নারী। চা পাতা বা কুঁড়ি তোলার প্রধান কাজটি তারাই করেন। তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ন্যায্য মজুরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা এখনো পিছিয়ে আছেন। অনেক নারী শ্রমিকের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে শ্রম দিলেও তাদের জীবনে তেমন পরিবর্তন আসেনি।
চা বাগানের নারী শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবন শুরু হয় ভোর থেকেই। সোম থেকে শনিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বাগানে কাজ করতে হয়। কেউ সকালে খেয়ে কাজে যান, আবার অনেকেই সময়ের অভাবে বাটিতে খাবার নিয়েই ছুটতে হয় কাজে। দুপুরের খাবার বলতে থাকে ‘পাতিচখা’ বা পাতি চাটনি—চাল ভাজা, চায়ের কুঁড়ি পাতা, পেঁয়াজ, রসুন ও মরিচ দিয়ে তৈরি এক ধরনের খাবার। দিনের কাজ শেষে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৮টার দিকে বাসায় ফিরতে হয়। এরপর আবার শুরু হয় সংসারের কাজ।
নিজেদের জীবনযাত্রা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর ও মাধবপুর চা বাগানের নারী শ্রমিকরা। তারা জানান, প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ কেজি চা পাতা তুলে মজুরি পান মাত্র ১৭৮ টাকা। অনেক সময় নির্ধারিত পরিমাণের বেশি পাতা তুললেও অতিরিক্ত মজুরি পান না। কর্মস্থলে নেই পর্যাপ্ত শৌচাগারের ব্যবস্থাও।
নারী শ্রমিকদের দাবি শুধু ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানুষের মতো বেঁচে থাকার অধিকার।
কমলগঞ্জের শমশেরনগর দেওছড়া চা বাগানের নারী শ্রমিক গীতা রবিদাস বলেন, “প্রতি বছর নারী দিবসের কথা শুনি, কিন্তু আমাদের জন্য তেমন কোনো পরিবর্তন দেখি না। ছুটিও পাই না, বিশেষ কোনো সুবিধাও নেই। আমাদের বঞ্চনার গল্প যেন শেষই হয় না।”
কানিহাটি চা বাগানের শ্রমিক রুকমনিয়া মৃধা বলেন, ‘কম মজুরির কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে এই পেশা ছাড়ছেন। দারিদ্র্যের কারণে অনেক সময় সন্তানদেরও পড়াশোনা ছেড়ে একই পেশায় যুক্ত হতে হয়।’১
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক উপদেষ্টা রামভজন কৈরী বলেন, চা বাগানে অর্ধেক শ্রমিক নারী হলেও তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এখনও নিশ্চিত হয়নি। কর্মস্থলে শৌচাগার নেই, শিশুদের জন্য ডে-কেয়ার নেই। নারী শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সমস্যা ও কল্যাণ বিষয়ে কথা বলার জন্য প্রতিটি বাগানে একজন নারী কর্মকর্তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা বলেন, শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ নিয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হলেও অনেক সমস্যার সমাধান এখনও হয়নি। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের জন্য কর্মক্ষেত্রে শৌচাগারের অভাব বড় সমস্যা হয়ে আছে।
এদিকে বাংলাদেশীয় চা সংসদের সিলেট অঞ্চলীয় সভাপতি জিএম শিবলী বলেন, অনেক চা বাগান বর্তমানে আর্থিক সংকটে রয়েছে। চায়ের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় অনেক মালিক শ্রমিকদের মজুরি দিতেও হিমশিম খাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে সবুজে ঘেরা চা বাগানের সৌন্দর্যের আড়ালে নারী শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম এখনও রয়ে গেছে কঠিন বাস্তবতার মধ্যে। তাদের একটাই প্রত্যাশা—ন্যায্য অধিকার ও সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









