দেশজুড়ে জ্বালানি তেল বিক্রির ওপর থেকে সরকারি বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হলেও দিনাজপুরের বীরগঞ্জে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। উল্টো বীরগঞ্জ পৌর এলাকায় অবস্থিত জননী ফিলিং স্টেশন এবং এসআর ফিলিং স্টেশন এন্ড সার্ভিসেস সেন্টার সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভূতভাবে তেল বিক্রিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। সরকারি নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে এই দুই পাম্প কর্তৃপক্ষ মোটরসাইকেল চালক ও সাধারণ গ্রাহকদের ২০০ টাকার বেশি তেল দিচ্ছে না। পাম্প কর্তৃপক্ষের এমন খামখেয়ালিপনায় সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের সহিংসতার রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জননী ও এসআর ফিলিং স্টেশনের সামনে শত শত মোটরসাইকেল ও সাধারণ মানুষের দীর্ঘ সারি। তীব্র রোদ আর দীর্ঘ অপেক্ষার পরও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি। পাম্প কর্তৃপক্ষ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, একজনকে ২০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া সম্ভব নয়। অথচ সরকারিভাবে তেলের সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই এবং বিক্রির ওপর কোনো সীমাও নির্ধারিত নেই। পাম্প দুটির এমন একতরফা সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র হাহাকার। তেল না পেয়ে অনেককে পাম্প কর্মীদের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে, যা পুরো এলাকায় একটি থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
তেল নিতে আসা একজন মোটরসাইকেল চালক তার চরম ভোগান্তির কথা তুলে ধরে জানান যে, তাকে জরুরি প্রয়োজনে ঠাকুরগাঁও যেতে হবে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর পাম্পের নজেলম্যান তাকে জানিয়ে দেন যে মাত্র ২০০ টাকার তেল দেওয়া হবে। বর্তমান বাজারে ২০০ টাকায় যে সামান্য পরিমাণ তেল পাওয়া যায়, তা দিয়ে কয়েক কিলোমিটার পথ চলাই দুষ্কর। তিনি অভিযোগ করেন যে, পাম্পে পর্যাপ্ত তেলের মজুত থাকা সত্ত্বেও তাদের এভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। পাম্পের এমন আচরণকে তিনি সাধারণ মানুষের সাথে এক ধরনের তামাশা বলে উল্লেখ করেন এবং অবিলম্বে এই অব্যবস্থাপনা বন্ধের জোর দাবি জানান।
শুধু বাইকাররাই নন, বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরাও। বর্তমানে সেচ মৌসুম চলায় অনেক কৃষকেরই বড় পরিমাণে ডিজেলের প্রয়োজন হচ্ছে। কিন্তু পাম্প কর্তৃপক্ষ ড্রাম বা বোতলে তেল দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে অথবা নামমাত্র তেল দিচ্ছে। একজন কৃষক আক্ষেপ করে জানান যে, তেলের অভাবে তার জমির সেচ কাজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বারবার পাম্পে আসা-যাওয়া করতে গিয়ে তাদের সময় ও যাতায়াত খরচ দুটোই বাড়ছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, পাম্পগুলো তেল মজুত রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে যাতে ভবিষ্যতে কোনো অজুহাতে বেশি দামে বিক্রি করা যায়। এই কৃত্রিম সংকটের কারণে স্থানীয় পণ্য পরিবহন ও সাধারণ যাতায়াত ব্যবস্থায় স্থবিরতা নেমে এসেছে।
তেল না পাওয়ার এই হাহাকার বীরগঞ্জের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। পাম্পের কর্মীদের সাথে সাধারণ জনগণের প্রায়ই বাগবিতণ্ডা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদা অনুযায়ী তেল না মেলায় অনেক যুবক ও শ্রমজীবী মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, দ্রুত এই সমস্যার সমাধান না হলে যেকোনো সময় পাম্পগুলোতে ভাঙচুর বা বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে। তেলের এই সংকটকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে, যা স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলার জন্য হুমকিস্বরূপ।
বীরগঞ্জের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, বর্তমানে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই এবং বিক্রির ওপর সরকারের কোনো বিধিনিষেধও নেই। জননী ফিলিং স্টেশন ও এসআর ফিলিং স্টেশন যদি ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রাহকদের ফিরিয়ে দেয় বা তেলের সীমা নির্ধারণ করে দেয়, তবে সেটি প্রচলিত আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। প্রশাসন থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, বীরগঞ্জের জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে এবং পাম্পগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধে খুব শীঘ্রই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালানো হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কারসাজির প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ সর্বোচ্চ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বীরগঞ্জ পৌর এলাকার সাধারণ মানুষের দাবি, দ্রুত এই অব্যবস্থাপনা বন্ধ করে তেলের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক। পাম্পগুলোর ওপর প্রশাসনের কঠোর নজরদারি না থাকলে সাধারণ মানুষ এভাবে জিম্মি হয়েই থাকবে। জনস্বার্থে দ্রুত তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করে জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনাই এখন বীরগঞ্জবাসীর প্রধান দাবি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









