বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

দেশে ফেরার আকুতি

কক্সবাজারে বন্দি জীবন, রোহিঙ্গাদের নীরব কান্না

এইচ এম ফরিদুল আলম শাহীন

প্রকাশিত: ২২ মার্চ ২০২৬, ০৭:০৮ পিএম

আপডেট: ২২ মার্চ ২০২৬, ০৭:০৮ পিএম

কক্সবাজারে বন্দি জীবন, রোহিঙ্গাদের নীরব কান্না

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ আজ যেন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যেরই এক সম্প্রসারিত জনপদ। এখানে বসবাসরত লাখো রোহিঙ্গার জীবনে ঈদ আসে, কিন্তু আনন্দ আসে না। স্বজন হারানোর বেদনা, ভিটেমাটি হারানোর স্মৃতি আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভারে তাদের ঈদ হয়ে উঠেছে নিঃশব্দ কষ্টের প্রতিচ্ছবি।

বাস্তুচ্যুত প্রায় ১৫-১৬ লাখ রোহিঙ্গা এবার নবমবারের মতো ঈদুল ফিতর উদযাপন করছেন বাংলাদেশে। শরণার্থী শিবিরের ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালিত হলেও উৎসবের আবহ ছাপিয়ে চোখে পড়ে দীর্ঘশ্বাস আর অপেক্ষার ক্লান্তি।

স্মৃতির ভারে নত একেকটি পরিবার
উখিয়ার ক্যাম্প-৭ ও ১১-তে কথা হয় নুর কামাল, কায়ছার, নূর কায়দা, জমিলা খাতুন ও খতিজা বিবির সঙ্গে। ঈদের দিনেও তাদের চোখ ভিজে ওঠে ২০১৭ সালের সেই ভয়াল স্মৃতিতে—যে রাতে তারা প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিলেন।
তাদের ভাষায়, “সেই রাতের কথা মনে পড়লে এখনো ঘুম ভেঙে যায়। আগুন, গুলি আর চিৎকার—সবকিছু এখনো চোখের সামনে ভাসে।”

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারে সহিংসতার মুখে লাখো রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। কাঁদামাখা শরীর, অনাহার, আতঙ্ক আর অমানবিক নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে তারা প্রবেশ করে এ দেশে। সে সময় মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বাংলাদেশ। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকার, দেশি-বিদেশি সংস্থা—সবাই এগিয়ে আসে তাদের পাশে।

প্রজন্মের প্রশ্ন, পিতার কান্না
কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা আজিজ উল্লাহর ছেলে সোলাইমান শাহ (১৫) জানে না তার জন্মভূমি কেমন ছিল। ঈদের দিন বাবাকে প্রশ্ন করে—“আমাদের গ্রাম কেমন ছিল? কোথায় ঈদ করতাম?”

প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ভেঙে পড়েন বৃদ্ধ পিতা। তিনি বলেন, “আমার জমি ছিল, ঘর ছিল, পুকুর ছিল, সব ছিল। কিন্তু সেই রাতেই সব শেষ হয়ে গেছে।”

তিনি আরো জানান, নির্যাতনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এখনো তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। পরিবারের সদস্য হারানোর বেদনা আর অপমানের স্মৃতি তাকে আজও বাকরুদ্ধ করে রাখে।

প্রতিশ্রুতির ঈদ, বাস্তবতার দেয়াল
২০২৫ সালের রমজানে এক ইফতার অনুষ্ঠানে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন—২০২৬ সালের ঈদ রোহিঙ্গারা নিজ দেশে উদযাপন করতে পারবে। সেই বক্তব্য নতুন আশার সঞ্চার করেছিল শরণার্থী শিবিরে। কিন্তু এক বছর পর সেই আশার কোনো বাস্তব রূপ দেখা যায়নি। বরং রাখাইনের পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেছে, যা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে করেছে আরও অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ।

সংকট আরও জটিল হচ্ছে
বর্তমানে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে অবস্থান করছেন ১৫ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসা, ঘনবসতি, সীমিত সম্পদ এবং কর্মসংস্থানের অভাব তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার জন্য ৭১০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা চাওয়া হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম। ফলে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো মৌলিক সেবাগুলো হুমকির মুখে পড়েছে। দিন দিন রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বাড়লে ও কমছে খাদ্য সহায়তা।

নতুন অনুপ্রবেশ ও বাড়তি চাপ
মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চের প্রথম দুই সপ্তাহেই প্রায় ৫০০ রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। গত তিন বছরে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজারে।

সরকারি সূত্র বলছে, নতুন করে শরণার্থী গ্রহণের সক্ষমতা বাংলাদেশের আর নেই। ইতোমধ্যে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও পড়েছে ব্যাপক সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ।

বন্দি জীবনের ঈদ
শনিবার (২১ মার্চ) যখন দেশের মানুষ উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠে, তখন কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ঈদ কাটে নিঃশব্দ বেদনায়। হাজার হাজার রোহিঙ্গা নামাজ আদায় করলেও তাদের কণ্ঠে নেই উৎসবের উচ্ছ্বাস।

কুতুপালংয়ের ইউনুস আরমান বলেন, “সময় যত যাচ্ছে, আমাদের জীবন তত কঠিন হচ্ছে।”

থাইংখালী ক্যাম্পের আজিজুর রহমানের ভাষায়, “খাঁচায় বন্দি জীবনের মতোই আমাদের ঈদ কাটে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান নির্ভর করছে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর। নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়।

অনিশ্চয়তা আর বেদনার ভার নিয়েই তারা অপেক্ষা করে আছে—একটি নিরাপদ প্রত্যাবাসনের, একটি স্বাভাবিক জীবনের, আর একদিন নিজের দেশে ঈদ পালনের মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আকুতি।

কক্সবাজার/অই

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.