কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী মরাগাছতলা এলাকা—যেখানে একসময় স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবন চলত—আজ সেখানে কাঁটাতারের বেড়ার ভেতরে বন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ২৫০টি পরিবার। ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সম্প্রসারণে এই পরিবারগুলোর বসতভিটা কাঁটাতারের ঘেরের ভেতরে পড়ে যাওয়ায় তারা কার্যত অবরুদ্ধ জীবনযাপন করছে।
এই পরিবারগুলোর প্রায় ১,৩০০ নারী, পুরুষ ও শিশু দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। কাঁটাতারের ভেতরে সীমাবদ্ধ জীবন যেন তাদের জন্য এক অঘোষিত কারাগার।
মানবিকতার বিনিময়ে বঞ্চনা:
স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টে শুরু হওয়া রোহিঙ্গা সংকটের সময় তারা নিজেদের জমি ও বসতভিটায় মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছিলেন বাস্তুচ্যুত মানুষদের। কিন্তু আজ সেই মানবিকতার মূল্য দিচ্ছেন তারা নিজেরাই—নিজ দেশে থেকেও হয়ে উঠেছেন অসহায় ও অধিকারবঞ্চিত।
ভুক্তভোগী নুরুল আমিন রহিম উল্লাহ (৪৮) বলেন,
“আমরা মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছিলাম। এখন আমরা নিজেরাই বন্দি। দুই বেলা খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে গেছে।”
জীবিকার পথ রুদ্ধ:
অবরুদ্ধ পরিবারগুলোর প্রধান সংকট এখন জীবিকা। অভিযোগ রয়েছে, ক্যাম্প ইনচার্জের অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বিধবা লাইলা বেগম জানান, তার বসতভিটার সামনে গড়ে তোলা তিনটি দোকান ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
“২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল। দিতে না পারায় দোকান গুঁড়িয়ে দিয়েছে,”—অভিযোগ তার।
এমন অভিযোগ করেছেন আরও অনেক ব্যবসায়ী। তাদের দাবি, টাকা না দিলে দোকান বসানো যায় না, আর দিলে টিকে থাকার নিশ্চয়তাও নেই।
শ্রমবাজারেও সংকট:
স্থানীয়দের অভিযোগ, কম মজুরিতে কাজ করতে রাজি হওয়ায় রোহিঙ্গারা শ্রমবাজার দখল করে নিয়েছে। ফলে স্থানীয় দিনমজুরদের কাজের সুযোগ কমে গেছে। অনেক পরিবার চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য হচ্ছে।
শিশুদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত:
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র শিশুদের। কাঁটাতারের ভেতরে বড় হওয়া এসব শিশু অপুষ্টি ও মানসিক ট্রমায় ভুগছে। শিক্ষা ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার সুযোগ না থাকায় তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে পড়ছে।
নারীরাও স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারছেন না। কাঁটাতার পেরোতে গেলে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদসহ নানা বিধিনিষেধের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
প্রশাসনের বক্তব্য:
অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ১১ নম্বর ক্যাম্পের কেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স অফিসার রমজান আলী। তার দাবি, রাস্তার ওপর অবৈধভাবে স্থাপিত দোকান সরানো হয়েছে, যাতে যান চলাচলে সমস্যা না হয়। কোনো ধরনের অর্থ লেনদেন হয়নি বলে তিনি জানান। এসব অভিযোগ ক্যাম্পের বিরুদ্ধে কেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিনিতো এখন নেই, তিনিই ভাল বলতে পারবেন। আমার জানামতে অভিযোগ সত্য নয়।এ ব্যাপারে ক্যাম্প ইনচার্জকে একাধিক বার ফোন করে ও রিসিভ না হওয়ায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দীন চৌধুরী বলেন, “প্রায় ৪৫ হাজার স্থানীয় মানুষের বিপরীতে আশপাশে রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের ন্যূনতম জীবিকা নিশ্চিত না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।” উখিয়া থানার ওসি মুজিবুল হকও বিষয়টির মানবিক দিক বিবেচনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
সমাধানের দাবি:
মানবাধিকার কর্মী ও স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা দ্রুত এই সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠা ক্যাম্প ইনচার্জের অপসারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও জীবিকার নিশ্চয়তা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
বঞ্চিত মানুষের কথা প্রশাসনের কানে যাবে কি?
মানবিক সংকটে আশ্রয় দেওয়া মানুষগুলো আজ নিজেরাই মানবিক সংকটে নিমজ্জিত। কাঁটাতারের বেড়ার ভেতরে আটকে থাকা এই পরিবারগুলোর আর্তনাদ যেন দ্রুতই পৌঁছে যায় নীতিনির্ধারকদের কানে—এটাই এখন সময়ের দাবি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









