যশোরে একটি প্রাইভেটকার উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে রহস্য, আতঙ্ক ও অপরাধের এক জটিল জাল। প্রথমে এটি একটি সাধারণ ছিনতাই বা মালিকানা বিরোধ মনে হলেও ধীরে ধীরে এর অন্তরালে উঠে আসছে ভয়ংকর সোনা পাচার সিন্ডিকেটের তথ্য, যা পুরো ঘটনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক পক্ষের দাবি, পাল্টা দাবি এবং পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্য সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
মাগুরার শালিখা উপজেলার আড়পাড়া গ্রামের বাসিন্দা হিরা খাতুন প্রাইভেটকারটির মালিকানা দাবি করে জানান, তার ছেলে ফাইমুর রহমান সান, যিনি যশোর আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপ্যাল কলেজের শিক্ষার্থী, গত ৮ জানুয়ারি শহরের আরবপুর এলাকা থেকে রহস্যজনকভাবে অপহরণের শিকার হন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৩ থেকে ৪ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়, চোখ বেঁধে ফেলে এবং একটি ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। শুধু তাই নয়, তার ব্যবহৃত প্রাইভেটকার ও একটি আইফোনও ছিনিয়ে নেয়া হয়। পরবর্তীতে কোনোভাবে ছাড়া পেয়ে তিনি কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এই ঘটনার পর থেকেই পুরো বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে এবং গাড়িটির অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে থাকে।
কোতোয়ালি থানার এসআই অমৃতলাল দে জানায়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে মাগুরা থেকে প্রাইভেটকারটি উদ্ধার করে যশোরে নিয়ে আসা হয়েছে। কল্লোল নামে এক আইনজীবীর কাছে গাড়িটি ছিল এবং তিনি সেটি জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে হস্তান্তর করেন। বর্তমানে গাড়িটি কোতোয়ালি থানার হেফাজতে রাখা হয়েছে। তবে কীভাবে গাড়িটি মাগুরায় গেল, কার মাধ্যমে গেল এবং কেন সেটি অন্যের দখলে ছিল এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
ঘটনার আরেকটি ভয়ংকর দিক উঠে আসে হিরা খাতুনের বক্তব্যে। তিনি জানান, তার স্বামী আলী আহমেদ, যিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স হিসেবে কাজ করতেন, গত ৫ জানুয়ারি মারা যান। তার মৃত্যুর পরপরই বেনাপোলের কন্যদহ গ্রামের শহিদ হোসেন ওরফে ছোট শহিদ বা ‘গোল্ড শহিদ’সহ কয়েকজন ব্যক্তি তাকে নিয়মিত ফোন করে হুমকি দিতে থাকে। তাদের দাবি ছিল, আলী আহমেদ জীবিত অবস্থায় তাদের অনেক সোনার বার আত্মসাৎ করেছেন এবং সেই সোনা ফেরত দিতে হবে। অন্যথায় তাকে ও তার ছেলেকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। হিরা খাতুন দাবি করেন, তিনি এসব সোনা বা তার স্বামীর কোনো গোপন লেনদেন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। কিন্তু ক্রমাগত হুমকির কারণে তিনি চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন এবং অনেক সময় মোবাইল ফোন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন।
এদিকে পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র ভিন্ন তথ্য দিচ্ছে। তাদের দাবি, আলী আহমেদ কেবল সোর্স ছিলেন না, বরং তিনি নিজেই একটি সক্রিয় সোনা পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। প্রাইভেটকারটি ব্যবহার করে সীমান্তবর্তী এলাকায় যাতায়াত এবং ভারতের সঙ্গে সোনা পাচারের কাজে তার সম্পৃক্ততা ছিল। এমনকি সুযোগ বুঝে তিনি ওই চক্রের কিছু সোনার বার আত্মসাৎ করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার মৃত্যুর পর সেই সোনা উদ্ধারে মরিয়া হয়ে ওঠে সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট, এবং ধারণা করা হচ্ছে, সেই কারণেই গাড়িটি ছিনিয়ে নেওয়া হয় ও চাপ সৃষ্টি করা হয় পরিবারের ওপর।
কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাসুম খান এ বিষয়ে বলেন, মূলত দুই পক্ষের মধ্যে অর্থনৈতিক লেনদেনকে কেন্দ্র করেই বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। একটি পক্ষ গাড়িটি নিজেদের দখলে রাখে, পরে অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলে গাড়িটি নিজেদের হেফাজতে নেয়। তিনি জানান, প্রকৃত মালিকানা নিশ্চিত করতে কাগজপত্র যাচাই করা হবে এবং সঠিক মালিককে গাড়িটি হস্তান্তর করা হবে। পাশাপাশি পুরো ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং এর পেছনে কোনো বড় অপরাধ চক্র জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বেনাপোলের কন্যদহ গ্রামের শহিদ হোসেন ওরফে ছোট শহিদ, যিনি ‘গোল্ড শহিদ’ নামে পরিচিত, তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









