বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

শরীয়তপুরে হাইকোর্টের রায় অমান্য করে অবৈধ ইটভাটার দৌরাত্ম্য

শিশুশ্রমে ভরপুর ‘মৃত্যুফাঁদ’

প্রকাশিত: ৩০ মার্চ ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম

আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম

শিশুশ্রমে ভরপুর ‘মৃত্যুফাঁদ’

২০২২ সালে অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদের দাবিতে দায়ের করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা—সারা দেশে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ ও উচ্ছেদ করতে হবে। ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দেওয়া ওই রায়ে পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কোনো ইটভাটা পরিচালনা নিষিদ্ধ, কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে ভাটা স্থাপন বন্ধ এবং শিশু শ্রম সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়। একইসঙ্গে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়।
কিন্তু বাস্তব চিত্র যেন সম্পূর্ণ উল্টো। শরীয়তপুরে আদালতের রায়ের এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কার্যত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

জেলায় এখনো ৬টি উপজেলায় ৩৫টি ইটভাটা চালু রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ৪টির পরিবেশগত ছাড়পত্র আছে। বাকি প্রায় সবগুলোই অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। উচ্ছেদ করা হয়েছে মাত্র ৩-৪টি ভাটা—যা পুরো পরিস্থিতির তুলনায় নগণ্য।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সদর উপজেলায় ১৩টি, জাজিরায় ৫টি, নড়িয়ায় ৬টি, গোসাইরহাটে ৬টি, ভেদরগঞ্জে ৩টি এবং ডামুড্যায় ২টি ইটভাটা রয়েছে। এসব ভাটার অধিকাংশই প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। কোথাও পরিবেশ ছাড়পত্র থাকলেও অন্যান্য লাইসেন্স নেই, আবার কোথাও নবায়নই হয়নি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে দিন-রাত সমানতালে ইট পোড়ানো চলছে। অধিকাংশ ভাটা গড়ে উঠেছে ফসলি জমি, বসতবাড়ি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে। এতে একদিকে মারাত্মক বায়ুদূষণ সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে উর্বর কৃষিজমি নষ্ট হয়ে পড়ছে—যা আদালতের রায়ের সরাসরি লঙ্ঘন।

সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে শিশু শ্রমের ক্ষেত্রে। বিভিন্ন ভাটায় ৮ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। শরীয়তপুর সদরের চর ডোমসার এলাকায় মেঘনা ব্রিকসে গিয়ে দেখা যায়, ১০ বছর বয়সী আরাফাত মাটি সরবরাহের কাজ করছে। মাত্র ৬ মাসের জন্য ৪০ হাজার টাকায় তাকে কাজে আনা হয়েছে। একই ভাটার ১৬ বছর বয়সী নুর আলম জানায়, তাকে ৬ মাসে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার চুক্তি হয়েছে।

অন্যদিকে, কোয়ারপুর এলাকার যমুনা ব্রিকস ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে ৮ বছর বয়সী ইয়াসিন মাসে ৮ হাজার টাকায় ইট শুকানো ও বহনের কাজ করছে। জেলার বিভিন্ন ভাটায় অন্তত দেড় শতাধিক শিশু সরাসরি শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। পরিবারের সঙ্গে আসা শিশুদের ধরলে এই সংখ্যা ৫ শতাধিক ছাড়িয়ে যেতে পারে।

অভিযোগ রয়েছে, তথ্য সংগ্রহে গেলে অনেক ক্ষেত্রে ইটভাটা মালিকরা সাংবাদিকদের সঙ্গে অসহযোগিতা এমনকি আক্রমণাত্মক আচরণও করছেন। শরীয়তপুর জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি জলিল খান আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলতে না চাইলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেন, “সমস্যা গোড়াতেই, এখন যেভাবে পারি কাজ চালাচ্ছি।”

এদিকে প্রশাসনের অভিযানে কার্যকর কোনো পরিবর্তন আসছে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জরিমানা আরোপ করে দায় সারছে প্রশাসন। ফলে জরিমানা দিয়েই পুনরায় চালু রাখা হচ্ছে অবৈধ কার্যক্রম।

পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রাসেল নোমান বলেন, “চলতি মৌসুমে শরীয়তপুরে ৪টি ছাড়া বাকি সব ভাটাই অবৈধ। ইতোমধ্যে ৮টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে প্রায় ৯ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। শিগগিরই উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হবে।”

জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম জানান, অবৈধ ভাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে এবং যেগুলো নবায়নযোগ্য নয়, সেগুলো ধ্বংসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে শিশু শ্রমের বিষয়ে তিনি বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের সময় এ ধরনের ঘটনা সামনে আসে না।

পরিবেশবিদরা বলছেন, হাইকোর্টের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তা বাস্তবায়নে গাফিলতি মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। জরিমানার বদলে স্থায়ীভাবে ভাটা বন্ধ ও ধ্বংস না করলে পরিবেশ দূষণ, কৃষিজমির ক্ষতি এবং শিশু শ্রম কোনোভাবেই বন্ধ করা সম্ভব নয়। দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ না নিলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। 
 

কাওছার আল হাবীব/এদিন

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.

শিশুশ্রমে ভরপুর ‘মৃত্যুফাঁদ’ | The Daily Adin