যশোর জেলায় হামের প্রাদুর্ভাবের শঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে, যা মহামারির আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত দুই মাসে যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালে দুই শতাধিক শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে মার্চ মাসেই অন্তত ১০টি শিশুর শরীরে ল্যাব পরীক্ষায় হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। জেলা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্যমতে, সম্প্রতি পাঠানো ৮৯টি নমুনার মধ্যে ২১টি পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে, যার বেশিরভাগই ৯ মাসের কম বয়সী শিশু যারা এখনো টিকা নেওয়ার উপযুক্ত হয়নি।
হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় শয্যা সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। আইসোলেশন ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি থাকায় অনেক ক্ষেত্রে মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। প্রতিদিনই জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে র্যাশ নিয়ে নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে, যা হামের সংক্রমণ বৃদ্ধিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, একটি শিশুর ৯ মাস বয়স পূর্ণ হলে হামের প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়ার নিয়ম। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, টিকার বয়স হওয়ার আগেই শিশুরা ভাইরাসের কবলে পড়ছে।
এই বিষয়ে শিশু ওয়ার্ডের চিকিৎসক আম্বিয়া পারভীন সাথী জানান, সম্প্রতি হামের প্রভাব অনেক বেড়েছে, যা আগে এমন ছিল না।
বুধবার হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শিশু ওয়ার্ডের মাত্র ২৪টি বেডের বিপরীতে ৭৯ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। তিল ধারণের জায়গা না থাকায় অর্ধেকের বেশি শিশুকে মেঝেতে নিজেদের বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। তবে তিনি আশ্বস্ত করেছেন, ইপিআই বিভাগে হামের টিকার কোনো সংকট নেই।
রোগীর অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই টিকা না নেওয়ার কারণে বিপদে পড়ছেন। শহরের খালদ্বার রোড এলাকার বাসিন্দা মাহমুদা খাতুন বলেন, আমার মেয়ের টিকার কার্ড হারিয়ে গিয়েছিল, তাই হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়নি। জ্বর ও শরীরে র্যাশ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করলে ডাক্তাররা হামের কথা নিশ্চিত করেন।
একইভাবে মণিরামপুরের বাধন দাস জানান, প্রথমে স্থানীয় ক্লিনিকে নিয়েছিলাম, পরে হামের সন্দেহে শিশু হাসপাতালে পাঠানো হলে মেয়েকে ভর্তি করি। সদর উপজেলার আরজিনা খাতুন বলেন, আমার ছেলের বয়স ১১ মাস। অসুস্থ থাকায় টিকা দেওয়া হয়নি। এখন ১২ দিন ধরে অসুস্থ, পরে জানা গেল হামে আক্রান্ত।
চিকিৎসকদের মতে, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও নিয়ন্ত্রণযোগ্য। যশোর শিশু হাসপাতালের ওয়ার্ড ইনচার্জ সাইদা সুলতানা বলেন, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসজুড়ে হামের রোগী বাড়ছে। প্রতিদিন নতুন রোগী আসছে এবং অনেক শিশুর টিকা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের রেজিস্ট্রার ডা. আফসার আলী জানান, গত তিন মাসে ৪৫ জন শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল, তারা চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার পরও সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, যা নিয়ে গবেষণা চলছে।
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রস্তুতি থাকলেও রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হোসাইন শাফায়েত বলেন, আইসোলেশন ওয়ার্ডে হামের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে কয়েকজন শিশু ভর্তি রয়েছে। আমাদের প্রস্তুতি আছে, তবে রোগী বাড়লে চাপ তৈরি হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল বলেন, হামের প্রাদুর্ভাবের শঙ্কায় আমরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। জেলার সব সরকারি হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। শিশুদের জ্বর বা র্যাশ দেখা দিলে স্কুলে না পাঠিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার অনুরোধ করছি। তিনি আরও জানান, হামের টিকা ১০ ও ১৫ মাস বয়সে দেওয়া হয়, ফলে অনেক শিশু টিকা নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, জেলায় টিকার কোনো ঘাটতি নেই। সচেতনতা বাড়ালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা এদিনকে বলেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি বা শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগে সাধারণত জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ি দেখা যায়। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এর ঝুঁকি বেশি এবং টিকা না নেওয়া ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ বেশি ঝুঁকিতে থাকে। হামের কারণে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অন্ধত্ব এবং মস্তিষ্কের সংক্রমণের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে, যা কখনো প্রাণঘাতীও হতে পারে। এ রোগের নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকলেও লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার এবং পানি পান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা গ্রহণ। পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা, ভিড় এড়িয়ে চলা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









