বাড়ি থেকে জোরপূর্বক মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে এক যুবককে মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে এক লাখ টাকা চেয়ে ২০ হাজারে রফা করে পুলিশ বলল- ‘আল্লাহ ভরসা, স্যার যেহেতু বলছে... সমস্যা নাই’। এভাবেই মুক্তি মিলেছে ঢাকা থেকে শৈলকুপায় বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে আসা এক যুবকের।
ঝিনাইদহের শৈলকুপা থানার দুই এসআইসহ ৪ কনস্টবলের এমনকাণ্ড ভুক্তভোগীর ধারণকৃত এক ভিডিও স্যোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ায় জেলাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এতে পুলিশের ভাবমূর্তি নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। এমন ঘটনায় জেলা পুলিশ দ্রুত ঘটনার অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু করে।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) প্রাথমিক তদন্তে হুমকিসহ ব্লাকমেইল করে টাকা আদায়ের ঘটনা প্রমাণিত হওয়ায় শৈলকুপা থানার অভিযুক্ত এসআই হুমায়ুন কবির ও এসআই আজগর ফরাজিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সাথে বৃহত্তর পরিসরে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সহকারী পুলিশ সুপার (শৈলকুপা সার্কেল) আক্তারুজ্জামান।
তথ্যানুসন্ধান ও ভুক্তভোগীদের ধারণকৃত ভিডিও সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে নাবিল হোসাইন নামের এক যুবক গত ২৮ মার্চ (শনিবার) ঝিনাইদহের শৈলকুপায় পৌর এলাকার বাজারপাড়ায় তার বন্ধু রিফাত হোসেনের বাড়ি বেড়াতে আসে। রিফাত ও নাবিলসহ বন্ধুরা মিলে পরদিন ২৯ মার্চ (রবিবার) যখন অপর বন্ধু তানভিরের বাড়িতে অবস্থান করে তখন সন্ধার দিকে সাদা পোষাকে ৪ ব্যক্তি ঘরে ঢুকে ঘর তল্লাসীর নামে ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি করে। এসময় একাধিক মামলার ওয়ারেন্টের আসামি জানিয়ে নাবিলের বন্ধু রিফাতের হাতে হাতকড়া লাগিয়ে পড়ায়।
একপর্যায়ে পুলিশ পরিচয় দিয়ে ১ লাখ টাকা দাবি করে রিফাতের কাছে। পরে তাদের মোটরসাইকেলে তুলে শহরের দিকে নিয়ে আসলে ভয়ে নাবিল ঢাকায় তার বাড়িতে ফোন করে এবং পুলিশের সাথে ২০ হাজার টাকায় রফাদফা করে। শৈলকুপা শহরের কবিরপুরে ইসলামী ব্যাংকের বুথ থেকে টাকা তুলে থানার এসআই আজগর ফরাজির হাতে ২০ হাজার টাকা তুলে দেয়। এ সময় সাদা গেঞ্জি পরিহিত এসআই আজগর বলে ‘আল্লাহ ভরসা, স্যার যেহেতু বলছে, কোন সমস্যা নাই’। এরপর রিফাত ও নাবিলকে শহরের চৌরাস্তা মোড়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তবে নাবিল মোটরসাইকেল যাবার পথে কৌশলে মোবাইলে ভিডিও ধারণসহ মুক্তির পর একটি ভিডিও বক্তব্যে পুলিশের নীতি-নৈতিকতা ও দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং ব্লাকমেইলিং অভিযোগ তুলে বিচার প্রত্যাশা করেন।
জানা গেছে, শৈলকুপা থানার এসআই হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে এসআই আজগর ফরাজিসহ ৪ কনস্টেবল এই অভিযান চালায়। এসআই হুমায়ুন এরআগে শৈলকুপা থেকে বদলি হলেও অদৃশ্য ক্ষমতাবলে ফের শৈলকুপা থানায় যোগ দেন এবং বিতর্কিত কর্মকান্ড চালাতে শুরু করেন বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।
নাবিল হোসাইন নামের ভুক্তভোগী ওই যুবক বলেন, “আমি বাংলাদেশ এয়ারফোর্স শাহীন কলেজের শিক্ষার্থী। ঢাকা থেকে বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলাম। হঠাৎ পুলিশ এসে আমাদের ধরে নিয়ে টাকার বিনিময়ে ছাড়ে। আমার কাছে টাকা না থাকায় আজগর নামের ওই পুলিশ সদস্য তার মোটরসাইকেলে নিয়ে এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলিয়ে নিয়ে মুক্তি দেয়।”
এই ঘটনা জানাজানির পরপরই ঝিনাইদহ জেলা পুলিশ গুরুত্ব সহকারে ঘটনার অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু করে। মার্চের ৩০ তারিখে সহকারী পুলিশ সুপার শৈলকুপা সার্কেল অভিযোগের অনুসন্ধানের কথা উল্লেখ করে রিফাতের বাবা আজিজুল হক, তানভীর, সীমান্ত ও তাদের অভিভাবকসহ ৫ জনকে জরুরি নোটিশ জারি করে। ১ এপ্রিল তাদের সার্কেল অফিসে হাজিরের অনুরোধ করা হয়।
এই ঘটনা সম্পর্কে অভিযুক্ত শৈলকুপা থানার এসআই হুমায়ুন কবির ওই যুবকদের বাড়ি থেকে ধরে শৈলকুপা শহরে আনা ও ছেড়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও টাকা নেওয়া ও ওয়ারেন্টের আসামি ছেড়ে দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।
শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবির মোল্লা বলেন, “আমি ছুটিতে আছি, আমাদের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেন।”
ঝিনাইদহের সহকারী পুলিশ সুপার (শৈলকুপা সার্কেল) আক্তারুজ্জামান বলেন, “প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় শৈলকুপা থানার এসআই হুমায়ুন ও এসআই আজগর ফরাজিকে শৈলকুপা থানা থেকে ক্লোজড করা হয়েছে এবং বৃহত্তর পরিসরে ঘটনার তদন্ত চলছে।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









