মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ২৩ চৈত্র ১৪৩২

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

বৈশাখের বাজারে নতুন প্রাণ, ব্যস্ত বাউফলের মৃৎশিল্পীরা

প্রকাশিত: ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪৯ পিএম

আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪৯ পিএম

বৈশাখের বাজারে নতুন প্রাণ, ব্যস্ত বাউফলের মৃৎশিল্পীরা

বাংলা নববর্ষকে ঘিরে যখন চারদিকে উৎসবের প্রস্তুতি, তখন পটুয়াখালীর বাউফলের পালপাড়ায় বইছে কর্মচাঞ্চল্যের ভিন্ন সুর। পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে এখানকার মৃৎশিল্পীদের দিন-রাত কাটছে মাটির পণ্য তৈরির ব্যস্ততায়। ঐতিহ্যবাহী এই গ্রামে এখন কেউ চাকা ঘুরিয়ে পণ্য গড়ছেন, কেউ রঙের আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলছেন নান্দনিকতা, আবার কেউ ব্যস্ত শুকানো, পোড়ানো ও সরবরাহের প্রস্তুতিতে।

বর্ষবরণকে কেন্দ্র করে পালপাড়ার কারিগররা তৈরি করছেন পান্তা পরিবেশনের থালা-বাসন, মগ, মিষ্টির পাতিল, ফুলদানি, ডিনার সেট, কাপ-পিরিচসহ নিত্যব্যবহার্য ও সৌখিন নানা মাটির সামগ্রী। বৈশাখী আয়োজনে মাটির পণ্যের আলাদা আবেদন থাকায় পাইকার ও ক্রেতাদের চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দশক ধরে পালপাড়া এ অঞ্চলের মৃৎশিল্পের একটি পরিচিত নাম। একসময় বৈশাখী মেলায় এখানকার মাটির খেলনা ছিল শিশুদের বড় আকর্ষণ। সময়ের পরিবর্তনে সেই চিরচেনা খেলনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক নকশা ও নতুন নতুন পণ্য। এখন আর শুধু খেলনাতেই সীমাবদ্ধ নেই এই শিল্প; বরং গৃহসজ্জা, পরিবেশন সামগ্রী ও শোপিস—সব মিলিয়ে পালপাড়ার মৃৎশিল্প পেয়েছে নতুন বাজার।

কারিগরদের তৈরি পণ্য এখন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় বিপণিবিতানে যাচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী ব্র্যান্ড আড়ংয়েও বিক্রি হচ্ছে পালপাড়ার তৈরি মাটির সামগ্রী। শুধু দেশীয় বাজার নয়, গত কয়েক বছরে বিদেশেও পৌঁছাতে শুরু করেছে এই গ্রামের পণ্য। এতে স্থানীয় শিল্পীদের মধ্যে যেমন উৎসাহ বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বড় পরিসরে উৎপাদনের স্বপ্নও।

তবে বৈশাখের এই ব্যস্ত মৌসুমেও চিন্তার ভাঁজ রয়ে গেছে কারিগরদের কপালে। মাটি, জ্বালানি ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ অনেকটাই বেড়ে গেছে। ফলে কাজের চাপ বাড়লেও লাভের অঙ্ক আগের মতো থাকছে না। স্থানীয় বাজারে চাহিদা থাকলেও কাঙ্ক্ষিত আয় হবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।

মৃৎশিল্পসংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর ভাষ্য, ভালো মানের মাটি সংগ্রহ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি যোগ হওয়ায় ছোট কারিগরদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবু বৈশাখকে ঘিরে আসা অর্ডারগুলোই তাদের নতুন করে আশাবাদী করে তুলেছে।

পালপাড়ার মৃৎশিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন প্রয়াত রাজেশ্বর পাল। স্থানীয়দের মতে, তিনি একসময় বৈশাখী মেলায় ঘুরে ঘুরে মাটির খেলনা ও বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করে এই শিল্পকে পরিচিতি এনে দেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কারখানার পণ্য এখনও দেশের বড় বাজারে সরবরাহ হচ্ছে। তাঁর হাত ধরেই পালপাড়ার মৃৎশিল্প আজ বৃহত্তর পরিসরে পরিচিতি পেয়েছে বলে মনে করেন এলাকাবাসী।

বর্তমানে এই শিল্পের সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে প্রায় অর্ধশত পরিবার। একসময় যেখানে ১০০ থেকে ১৫০ জন শ্রমিক কাজ করতেন, এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৩০ থেকে ৫০ জনে। তারপরও যারা টিকে আছেন, তারা বলছেন—ঐতিহ্যের এই পেশা সহজে ছাড়ার কথা ভাবছেন না।

বাউফল পালপাড়া মৃৎশিল্প সমিতির সভাপতি বিশ্বেশ্বর পাল বলেন, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ক্রেতা ও পাইকারদের চাপ বেড়েছে। তাদের তৈরি পণ্য ঢাকার আড়ংসহ বিভিন্ন বড় বিপণিবিতানে বিক্রি হচ্ছে এবং বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। তবে সরকারি আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং কাঁচামাল সহজলভ্য হলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব হতো। বিশেষ করে উন্নতমানের মাটির সংকট এখন তাদের বড় বাধা।

শুধু নববর্ষ নয়, বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান, ঘর সাজানো কিংবা উপহার—বিভিন্ন প্রয়োজনেই পালপাড়ার মাটির পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও ব্যবহারিকতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই শিল্প এখন স্থানীয় অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালেহ আহমেদ বলেন, পালপাড়ার মৃৎশিল্প এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভাবনাময় শিল্পগুলোর একটি। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে এখানকার কারিগরদের ব্যস্ততা বেড়েছে, যা ইতিবাচক দিক। তিনি জানান, যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এ শিল্প দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানি খাতেও আরও বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

ঐতিহ্যের মাটি ছুঁয়ে গড়া পালপাড়ার এই শিল্প এখন নতুন সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে। তবে সেই সম্ভাবনাকে টেকসই সাফল্যে রূপ দিতে প্রয়োজন পরিকল্পিত সহায়তা, সহজ ঋণ এবং কাঁচামালের নিশ্চয়তা—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

টিআর

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.