তপ্ত দুপুর। আকাশ থেকে যেন আগুন ঝরছে। যমুনার চরাঞ্চল আর ব্যবসায়ীদের চাতাল যেন লাল মরিচের গালিচা। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কে যেন বিশাল এক লাল গালিচা পেতে রেখেছে। বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা ও বাঙালি নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চলে এখন চলছে ‘লাল মরিচ উৎসব’। রোদ-ক্লান্তি উপেক্ষা করে কয়েক হাজার নারী শ্রমিক এখন ব্যস্ত এই লাল মরিচ ঘরে তুলতে।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যানুযায়ী, এ বছর সারিয়াকান্দির উর্বর চরাঞ্চলে ২ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে মরিচের চাষ হয়েছে। কৃষকরা এখন ভুট্টা চাষের দিকে বেশি ঝুঁকলেও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় মরিচের ফলন এবার নজরকাড়া। এর মধ্যে ১ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে উচ্চফলনশীল হাইব্রিড এবং ৮৭০ হেক্টর জমিতে দেশি জাতের মরিচ লাগানো হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, দেশি মরিচ মৌসুমে ৪ বার তোলা গেলেও হাইব্রিড মরিচ তোলা যায় ১০ থেকে ১৫ বার। এই দীর্ঘমেয়াদী ফসলের কারণেই এখানে শ্রমিকের চাহিদা সারা বছরই তুঙ্গে থাকে।
চরাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, মরিচ তোলার মাঠ থেকে শুরু করে চাতালে শুকানো পর্যন্ত সবখানেই নারীদের আধিপত্য। বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক এই খাতে কাজ করছেন, যার প্রায় ৮০ শতাংশই নারী। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, মরিচ তোলার ক্ষেত্রে নারীদের আঙুলের নিপুণতা ও ধৈর্য পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি, যা ফসলের গুণগত মান ধরে রাখতে সাহায্য করে। তবে এই হাড়ভাঙ্গা খাটুনির বিনিময়ে তাদের মজুরি মাত্র ৩০০ টাকা। পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায় এই মজুরি কম হলেও, অভাবী পরিবারগুলোর কাছে এটিই বড় আশার আলো।
ফুলবাড়ী ও মালোপাড়া গ্রামের চাতালে মরিচ শুকাচ্ছিলেন মোরশেদা খাতুন ও শ্রীমতি কমেলা রানী। কপালে জমে থাকা ঘাম মুছতে মুছতে মোরশেদা বলেন, "হামরা গরিব মানুষ, কষ্টই হামাগের ভাগ্য। তয় এই মরিচের সিজন আসলে হামাগের ঘরে চুলা জ্বলে। স্বামী অসুস্থ, ছাওয়াল-পাওয়ালের পড়ালেখা সবই এই মরিচ তোলার টাকায় হয়। রোদে গা পুড়লেও হাতে যখন নগদ টাকা পাই, তখন সব কষ্ট সার্থক মনে হয়।
আদুরী নামের আরেক শ্রমিক জানান, অভাবের জ্বালার কাছে এই চৈত্রের তপ্ত রোদের তাপ কিছুই নয়। এই মৌসুমে অর্জিত আয় দিয়েই তারা বছরের একটা বড় সময় সংসার চালান।
সারিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, "চরাঞ্চলের নারীরা এখন কেবল গৃহিণী নন, তারা স্থানীয় কৃষি অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। মরিচ প্রক্রিয়াজাতকরণে তাদের যে দক্ষতা, তা অতুলনীয়। ভুট্টা চাষের কারণে মরিচের আবাদ কিছুটা কমলেও ফলন ভালো হওয়ায় বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এই বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে শ্রমের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করলে নারীরা আরও উৎসাহিত হবে এবং চরাঞ্চলে উন্নত হিমাগার ও
প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করলে মরিচ নষ্ট হবে না, এতে কৃষকরা নায্যমূল্য পাবেন।
সারিয়াকান্দির এই লাল মরিচ কেবল একটি মসলা নয়, এটি চরাঞ্চলের হাজারো সংগ্রামী নারীর স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার রসদ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









