দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চিকিৎসা সেবায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও এখানে বিনা মূল্যে জটিল মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচার করে ইতোমধ্যে ৪৫ জন রোগীকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এতে করে দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের মাঝে তৈরি হয়েছে নতুন আশার আলো।
যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ঝাউদিয়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল লতিফ (৪৫) সেই সৌভাগ্যবানদের একজন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এক সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে তিনি যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন, তার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে গেছে। শারীরিক অবস্থা জটিল হওয়ায় দ্রুত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের চিকিৎসকরা সফলভাবে তার মেরুদণ্ডে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। আব্দুল লতিফ বলেন, বেসরকারি হাসপাতালে এই অপারেশন করতে দুই লক্ষ টাকার বেশি লাগতো, যা আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল। সরকারি হাসপাতালে বিনা খরচে চিকিৎসা পেয়ে আমি নতুন জীবন পেয়েছি।
শুধু আব্দুল লতিফই নন, মনিরামপুর উপজেলার ছালামতপুর গ্রামের কেসমত আলীসহ (৫৫) আরও অনেকে এই সেবার মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন। কেসমত আলী জানান, দুর্ঘটনায় আমার মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসার খরচ নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। পরে যশোর জেনারেল হাসপাতালে বিনা মূল্যে অপারেশন করে এখন ভালো আছি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর বাংলাদেশ স্পাইন সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. শাহআলম যশোরে একটি সেমিনারে অংশ নেন। ওইদিন তার নেতৃত্বে চিকিৎসকদের একটি দল পরীক্ষামূলকভাবে দুইজন রোগীর মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচার করেন। সেই সফলতার ধারাবাহিকতায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এই কার্যক্রম, যা এখন নিয়মিত সেবায় পরিণত হয়েছে।
যশোর মেডিকেল কলেজ (যমেক) হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. জহিরুল ইসলাম বলেন, যমেকে আলাদা স্পাইন সার্জারি বিভাগ না থাকলেও চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমরা জটিল অপারেশনগুলো সফলভাবে করতে পারছি। এখন পর্যন্ত ৪৫ জন রোগীর অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই দরিদ্র।
তিনি আরও জানান, মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচার সাধারণত দুই ধরনের পিএলআইডি (PLID) এবং স্ক্রু ফিক্সেশন। বেসরকারি হাসপাতালে পিএলআইডি করতে ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকা এবং স্ক্রু ফিক্সেশনে দুই লক্ষাধিক টাকা খরচ হয়। সরকারি হাসপাতালে পিএলআইডি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হচ্ছে, তবে স্ক্রু ফিক্সেশনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় স্ক্রুর খরচ রোগীর স্বজনদের বহন করতে হয়।
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আহসান কবির বাপ্পি বলেন, সরকারি ব্যবস্থাপনায় মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচার চালু হওয়ায় আমাদের হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা এক ধাপ এগিয়েছে। গরিব রোগীরা এখন বড় ধরনের চিকিৎসা বিনা খরচে পাচ্ছেন। তবে অপারেশন থিয়েটারের জায়গা সংকটের কারণে নিয়মিতভাবে বেশি সংখ্যক অপারেশন করা সম্ভব হচ্ছে না।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত বলেন, এই উদ্যোগ যশোরের চিকিৎসা খাতে একটি মাইলফলক। চিকিৎসকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা সফলভাবে স্পাইন সার্জারি চালিয়ে যাচ্ছি। ভবিষ্যতে আরও উন্নত সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









