সরকারি কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি বাড়ির উঠানে ঢুকতেই মুহূর্তেই কান্না আর আহাজারিতে ভেঙে পড়ে পরিবার-পরিজনসহ পুরো গ্রাম। স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে এলাকা।
রবিবার (২৬ এপ্রিল) বিকেলে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার ডুমুরিয়া ইউনিয়নের ডুমুরিয়া উত্তরপাড়া (বাবুপাড়া) এলাকার এ আবেগঘন পরিস্থিতি তৈরি হয় ।
বুলেটের চাচা বিমল বৈরাগী বলেন, “জীবনে কাউরে নখের আঁচড়ও দেয় নাই, কেউ তার দিকে আঙুলও তোলে নাই। সেই শান্ত ছেলেটার লাশ আজ রাস্তায় পড়ে থাকতে হলো! আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে…।”
এই মৃত্যু শুধু একটি প্রাণহানিই নয়, এটি যেন একটি পরিবারের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের নির্মম পরিসমাপ্তি।
বুলেটের বাবা সুশীল বৈরাগী ছেলেকে মানুষ করতে নিজের শেষ সম্বল ২৭ শতক ধানের জমি বিক্রি করেছিলেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করে চালিয়েছেন সংসার ও ছেলের পড়াশোনা। মা লিলিমা বৈরাগী নিজের কানের স্বর্ণ বিক্রি করে ছেলের ভবিষ্যৎ গড়ার পথ খুলে দিয়েছিলেন।
মায়ের সেই লুকানো কষ্টের কথা বলতে গিয়ে স্বজনরা জানান, তিনি ছেলেকে বলতেন, তুই বন্ধুদের কাছে বলবি না, তোর বাবা অন্যের জমিতে কাজ করে।
কিন্তু বুলেট গর্ব করে বলত, আমার বাবা অন্যের জমিতে কাজ করে আমাকে পড়ান, এটাই আমার সবচেয়ে বড় গর্ব।
অভাবের সংসারে বড় হলেও স্বপ্ন ছিল বড়। সুশান্ত বৈরাগী জানান, একটি ছেঁড়া জামা নিজেই সেলাই করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন বুলেট। বাড়ি ফিরে হাসতে হাসতেই বলতেন, “আমি নিজেই সেলাই করে পরে যাই।”
চাচাতো বোন দুলালী রানী মণ্ডল বলেন, “দাদার ছেলের এক বছর পূর্ণ হবে সোমবার। জন্মদিন করতে চট্টগ্রাম থেকে ফিরছিল… বড় চাকরি করাই কি তার জীবনের কাল হলো?”
পুরো এলাকায় এখন একটাই প্রশ্ন—এত শান্ত, নিরীহ একটি ছেলেকে কেন এভাবে প্রাণ দিতে হলো?
স্থানীয়রা জানান, মৃত্যুর কয়েকদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টকে ঘিরে কিছু মন্তব্য নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। পরিবার মনে করছে, ওই সূত্র ধরে তদন্ত করলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
বন্ধু তমার কণ্ঠেও আকুতি, আমার বন্ধুকে যারা এভাবে কষ্ট দিয়ে মেরেছে, তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।
রবিবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির উঠানে আমগাছের ছায়ায় নীরবে বসে আছেন স্বজনরা। কেউ কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। বৃদ্ধ দাদি নাতির লাশ দেখে প্রায় বাকরুদ্ধ। পাশেই কাঠের একটি বাক্স তৈরি করা হচ্ছে, সেই বাক্সেই চিরদিনের জন্য শুয়ে থাকবেন বুলেট।
চায়ের দোকানে বসে থাকা গ্রামবাসীরাও স্তব্ধ। কেউই বিশ্বাস করতে পারছেন না, হাসিখুশি, ভদ্র আর পরিশ্রমী ছেলেটির এমন পরিণতি হতে পারে।
বুলেট বৈরাগী ছিলেন সবার প্রিয়। ডুমুরিয়া বহুমুখী উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, গোপালগঞ্জ হাজী লালা মিয়া সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক সম্পন্ন করেন। কর্মজীবন শুরু করেন খাদ্য অধিদপ্তরে, পরে ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার হিসেবে ঢাকা কাস্টমস কার্যালয়ে যোগ দেন। সর্বশেষ কর্মরত ছিলেন কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে।
গত ২৪ এপ্রিল চট্টগ্রামে প্রশিক্ষণ শেষে কুমিল্লার বাসায় ফিরছিলেন তিনি। পরিবারের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলার পর হঠাৎই বন্ধ হয়ে যায় তার ফোন। পরদিন সকালে কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকায় সড়কের পাশে উদ্ধার হয় তার মরদেহ, মুখমণ্ডলে ছিল রক্তাক্ত চিহ্ন।
একটি সম্ভাবনাময় জীবনের এমন করুণ সমাপ্তি শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো গ্রামকেই স্তব্ধ করে দিয়েছে। এখন সবার একটাই দাবি—বুলেট বৈরাগীর হত্যার রহস্য উদঘাটন হোক, দোষীরা দ্রুত আইনের আওতায় আসুক।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









