প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল কমিউনিটি ক্লিনিক। স্বল্প খরচে, হাতের নাগালে চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়ার সুযোগ থাকায় এসব ক্লিনিক গ্রামীণ মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
তবে গত প্রায় ৪ মাস থেকে ওষুধ সংকটে থাকায় রাজশাহীর অধিকাংশ কমিউনিটি ক্লিনিকে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন সেবা নিতে আসা রোগীরা। অনেকেই ক্লিনিকে এসে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন, আবার বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে বাড়তি খরচে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। তবে কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ না থাকলেও চিকিৎসকেরা রোগীর রোগ অনুযায়ী ব্যবস্থাপত্র লিখে দিচ্ছেন।
জানা গেছে, আগে সরকারিভাবে জ্বর, সর্দি, কাশি, মাথাব্যথা, পাতলা পায়খানাসহ বিভিন্ন সাধারণ রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ২৭ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হতো কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে। কিন্তু বর্তমানে জ্বর, ডায়রিয়া, হাঁচি-কাশি ও অ্যান্টিবায়োটিকসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এখন কাগজে-কলমে ২২ ধরনের ওষুধ সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে সেই সরবরাহও অনিয়মিত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপিরা জানান, সর্বশেষ গত বছরের আগস্ট মাসে অধিকাংশ ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছিল। তখন যে পরিমাণ ওষুধ দেওয়া হয়েছিল, তা দিয়ে সর্বোচ্চ দুই থেকে তিন মাস কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়। এরপর প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন করে আর ওষুধ পৌঁছেনি। ফলে দিন দিন সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মধুসূদনপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসাসেবা নিতে রোগীদের ভিড় থাকলেও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে হতাশ হয়ে ফিরছেন অনেকে।
স্থানীয় বাসিন্দা সাইদুল আলী বলেন, “বাড়ির পাশে কমিউনিটি ক্লিনিক থাকায় আমরা অনেক উপকার পেতাম। আগে অসুস্থ হলে এখান থেকেই বেশিরভাগ ওষুধ পাওয়া যেত। খুব প্রয়োজন হলে বাইরে থেকে এক-দুটি ওষুধ কিনতে হতো। এখন প্রায় সব ওষুধই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। গরিব মানুষের জন্য এটা খুব কষ্টের।”
মধুসূদনপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি (চিকিৎসক) নূর আলম বলেন, “আমাদের এই কমিউনিটি ক্লিনিকে গড়ে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৪৫ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু বর্তমানে ওষুধের সরবরাহ না থাকায় আগের তুলনায় রোগীর সংখ্যাও কমেছে। চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ না পাওয়ায় আমরা রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ দিতে পারছি না। এতে রোগীরা হতাশ হচ্ছেন।”
শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের ছয় দিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হলেও ওষুধ না থাকায় সেই সেবার কার্যকারিতা অনেকটাই কমে গেছে। চিকিৎসকের পরামর্শ পেলেও ওষুধ না পাওয়ায় বাড়তি খরচে শহর বা বাজারের ফার্মেসি থেকে ওষুধ সংগ্রহ করতে হচ্ছে রোগীদের।
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার বেড়াবাড়ী কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি জাকিয়া বলেন, “প্রায় ৪ মাস ধরে আমাদের ক্লিনিকে কোনো ওষুধ নেই। বর্তমানে ওষুধের সংখ্যা একেবারেই শূন্য। আমরা রোগীদের প্রেসক্রিপশন দিতে পারছি, কিন্তু ওষুধ দিতে পারছি না। শুধু আমাদের ক্লিনিক নয়, গোটা মোহনপুর উপজেলার বেশিরভাগ কমিউনিটি ক্লিনিকেই একই অবস্থা। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া জরুরি।”
একই চিত্র বাগমারা উপজেলাতেও। দক্ষিণ জামালপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি সেলিম হোসেন বলেন, “বাগমারা উপজেলায় ৩৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। প্রায় সবগুলোতেই ওষুধ সংকট চলছে। আমরা শেষ ওষুধ পেয়েছি আগস্ট মাসে। এরপর আর কোনো সরবরাহ আসেনি। এখানে যারা চিকিৎসা নিতে আসেন, তাদের বেশিরভাগই গরিব ও অসহায় মানুষ। ওষুধ না থাকায় তাদের কষ্ট আরও বেড়েছে।”
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু পবা, মোহনপুর বা বাগমারা নয় রাজশাহীর প্রায় সব উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিকেই একই অবস্থা বিরাজ করছে। ফলে তৃণমূল পর্যায়ের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, যারা এই স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভরশীল, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
এক সপ্তাহের ভিতরেই ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে জানিয়ে রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এস.আই.এম রাজিউল করিম বলেন, “কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ওষুধ সরবরাহে কয়েক মাস ধরেই সংকট চলছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন কোনো প্রকল্প অনুমোদন না হওয়ায় সরবরাহে জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি এই সপ্তাহের মধ্যেই ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং সংকট কেটে যাবে।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









