খুলনার বেসরকারি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুল আলোচিত অবৈধভাবে দখলবাজ দুই ট্রাস্টি অবশেষে আদালতের রায়ে কুপোকাত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির দখলবাজ স্বঘোষিত চেয়ারম্যান মো: মিজানুর রহমান ও সদস্য সৈয়দ হাফিজুর রহমানের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য পদ অবৈধ ঘোষণা করেছেন আদালত।
রবিবার (৩ মে) খুলনার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক মো: শামীম সূফী চূড়ান্তভাবে এ রায় দিয়েছেন।
এর আগে গত ১৩ জানুয়ারি খুলনার সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের বিচারক রাশিদুল আলম তাদের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ প্রদান করেন। ওই আদেশের বিরুদ্ধে মো: মিজানুর রহমান ও সৈয়দ হাফিজুর রহমান আপিল করলেও আদালত তা খারিজ করে দেন। ফলে নিম্ন আদালতের আদেশ বহাল থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের ১৮ নভেম্বর খুলনার প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠাকালে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কেসিসির সাবেক মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তিনি আত্মগোপনে গেলে সকলের সিদ্ধান্তে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোনীত হন বিএনপি-সমর্থিত বোর্ড সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সিরাজুল হক চৌধুরী।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক চাপে মাধ্যমে মো: মিজানুর রহমান ও সৈয়দ হাফিজুর রহমানকে ট্রাস্টি বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সুপারিশ করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ২১ মে প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সিরাজুল হক চৌধুরী লন্ডনে অবস্থানকালীন সময়ে তাকে সরিয়ে নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন মো: মিজানুর রহমান এবং সৈয়দ হাফিজুর রহমানকে সদস্য সচিব করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেন তারা। তাদের অবৈধ কাজে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেন ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে নিয়োগকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার কানাই লাল সরকার, বোর্ড অব ট্রাস্টির লিয়াজো ডিরেক্টর আওয়ামী ঘরোনার শেখ মাহারুফুর রহমান, লিবারেল অব আর্টস ফ্যাকাল্টির ডিন ফারজানা আকতার। তাদের এ কাজে সহযোগিতা করার জন্য শিক্ষকদের একটি বড় অংশকেও অবৈধ সুযোগ-সুবিধার দিয়ে হাতে রেখেছেন।
আর এসকল বিষয়ে ছক আঁকছেন আওয়ামী লীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক ও খুলনা-৩ আসনের সাংসদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চেয়ারম্যান এস. এম কামালের ভগ্নিপতি ট্রাস্টি ড. রেজাউল আলম ও ভগ্নি নাহিদ নেওয়াজী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা, ট্রাস্টি প্রফেসর ড. বজলুল হক খন্দকার ও তার স্ত্রী সৈয়দা লুৎফা হক। এখনো তাঁরা কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড সদস্য হিসেবে বহাল থাকে এবং অবৈধ দখলবাজদের কাতারে থেকে একসাথে কাজ করে তা নিয়ে অনেকের প্রশ্ন?
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা, কর্মচারীদের একটা বড় অংশকে জিম্মি করে এবং কতিপয় শিক্ষার্থীদের মাসিক টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে মব তৈরি করে তারা প্রতিষ্ঠানটিতে রাজত্ব কায়েম করছে। তাদের মূল মিশন হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ডের মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। সম্প্রতি নগরীর লবণচরা থানাধীন স্থায়ী ক্যাম্পাসের পাইলিং এর কাজে তারা মোটা অংকের হাতিয়ে নিয়েছেন।
ইতোমধ্য তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা কে অন্যায় ভাবে চাকরিচ্যুত করেছেন। দলীয়ভাবে তাদের এই অপকর্ম ব্যালেন্স করার জন্য বিএনপি'র স্থানীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সুপারিশে অনেককে চাকরি দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও শিক্ষা মন্ত্রালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে জানান, মো: মিজানুর রহমান ও সৈয়দ হাফিজুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়টির কোন বৈধ ট্রাস্টি নন।
পরবর্তীতে ট্রাস্টি পবিত্র কুমার সরকার খুলনার সহকারী জজ আদালতে মো: মিজানুর রহমান ও সৈয়দ হাফিজুর রহমানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে রোববার আদালত রায়ে তাদের ট্রাস্টি পদকে অবৈধ ঘোষণা করেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশীদ বলেন, আদালত স্পষ্টভাবে বলেছেন, মো: মিজানুর রহমান ও সৈয়দ হাফিজুর রহমান বৈধ কোন ট্রাস্টি নন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। নিম্ন আদালতের নিষেধাজ্ঞাও বহাল থাকবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সিরাজুল হক চৌধুরী বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এমন দখল দারিত্বের মতো ঘৃণিত কাজ নিয়ে খুলনা তথা সারা দেশে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বৈধ ট্রাস্টিরা ফিরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়টির পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহন করলে প্রতিষ্ঠানের অস্থিরতা নিরসন হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









