তপ্ত রোদে পুড়ছে দেশ, তবে পাবনার ঈশ্বরদীতে প্রকৃতি যেন ভিন্ন সাজে সেজেছে। ধুলোমাখা শহরের পথঘাট এখন রক্তিম কৃষ্ণচূড়ার দখলে। এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় জমাচ্ছেন স্থানীয় শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত রাশিয়ান নাগরিকরাও।
গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর, চারদিকে রোদের প্রখরতা আর ধুলোবালি। অথচ ঈশ্বরদী শহরের চিত্রটা এখন একদম ভিন্ন। দেখে মনে হতে পারে, এখানে চলছে কোনো অকাল পুষ্পমেলা। আকাশের নীলকে আড়াল করে ডালপালাজুড়ে এখন শুধুই লালের জয়গান। বর্ণে সে কৃষ্ণ নয়, তবুও তার নাম কৃষ্ণচূড়া। বৃক্ষচূড়ায় বসে রক্তিম আভা ছড়িয়ে সে বিমোহিত করছে পথচারীদের। তবে সে একা নয়, এই মেলায় তার সঙ্গী হয়েছে হলুদ সোনালু, বেগুনি জারুল আর শুভ্র মধুমঞ্জরী। প্রতিটি ডাল যেন একেকটি সুবিন্যস্ত পুষ্পস্তবক।
প্রকৃতির এই রূপ থেকে চোখ ফেরাতে পারছেন না রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত বিদেশি নাগরিকরাও। প্রতিদিন বিকেলেই এই কৃষ্ণচূড়াতলায় দেখা মেলে রাশিয়ানদের। মুঠোফোনে ফ্রেমবন্দি করছেন লাল রঙের এই উৎসব। স্থানীয়দের পাশাপাশি তাঁদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে এলাকাটি।
শিক্ষক ও সাংবাদিক খায়রুল বাসার মিঠু বলেন, ‘কৃষ্ণচূড়া কেবল আমাদের প্রকৃতির শোভাবর্ধক নয়, বরং এটি গ্রীষ্মের খরতাপে এক প্রশান্তির প্রতীক এবং আমাদের পরিবেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রক্তিম লালে প্রকৃতিকে সাজানোর পাশাপাশি এটি বৈশ্বিক উষ্ণতা মোকাবিলায় এবং ভেষজ চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অসচেতনতায় আজ এই ঐতিহ্যবাহী বৃক্ষটি হারিয়ে যেতে বসেছে।
সলিমপুর ডিগ্রি কলেজের অফিস সহকারী মশিউর রহমান বলেন, ‘একসময় আমাদের পাবনার ঈশ্বরদী কৃষ্ণচূড়ার রঙে সেজে থাকত, কিন্তু নগরায়ণের ফলে আজ তা বিলীনপ্রায়। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা ও হারানো সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে আমাদের এখনই কৃষ্ণচূড়া রোপণ অভিযান শুরু করা জরুরি। আসুন, আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা আবারও লাল রঙের এক শান্তিময় সবুজ ঈশ্বরদী গড়ে তুলি।’
পল্লী চিকিৎসক হাফিজুর রহমান বলেন, ‘গ্রামের মানুষের কাছে কৃষ্ণচূড়া শুধু চোখের প্রশান্তি নয়, এটি আমাদের ভেষজ অমূল্য সম্পদ। প্রচণ্ড গরমে যখন শরীর জ্বালাপোড়া করে, তখন এই গাছের ছায়া আমাদের শান্তি দেয়। এর ছাল আর পাতারও রয়েছে নানা গুণ। দুঃখের বিষয়, ঈশ্বরদীর এই উপকারী গাছগুলো দিন দিন কমে যাচ্ছে। আবহাওয়া ও প্রকৃতিকে সুস্থ রাখতে আমাদের পাড়ায় পাড়ায় আবার কৃষ্ণচূড়া গাছ লাগানো দরকার।’
কবি ও শিল্পী এস এম রাজা বলেন, ‘প্রকৃতির ক্যানভাস থেকে কৃষ্ণচূড়ার সেই টকটকে লাল রঙটা যেন মুছে যাচ্ছে। আমাদের ঈশ্বরদীর রুপালি ধূসর দালানকোঠার মাঝে কৃষ্ণচূড়া ছিল জীবন্ত তুলির আঁচড়। সেই হারানো সৌন্দর্য আর নান্দনিকতা ফিরে পেতে আমাদের ক্যানভাসজুড়ে আবারও কৃষ্ণচূড়া রোপণের মহোৎসব প্রয়োজন।’
ফটোগ্রাফার ও কৃষ্ণচূড়া বৃক্ষ মালিক পারভেজ মোশারফ বলেন, ‘বাড়ির আঙিনায় একটি কৃষ্ণচূড়া মানে শুধু একটি গাছ নয়, এটি তপ্ত দুপুরে পরম শীতল ছায়া আর চোখের শান্তি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার লেন্স এখন আর ঈশ্বরদীর সেই রক্তিম কৃষ্ণচূড়া খুঁজে পায় না। নগরায়ণের ধূসর ক্যানভাসে কৃষ্ণচূড়া ছিল প্রকৃতির সেরা ফ্রেম।’
তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী মো. খোকন বলেন, ‘পোশাক ব্যবসায়ী হিসেবে আমরা মানুষের জীবনকে নতুন রঙ আর ফ্যাশনে রাঙিয়ে তুলি। কৃষ্ণচূড়া আমাদের শেখায় ধৈর্য এবং প্রতিকূলতার মাঝেও কীভাবে নিজের সেরাটা মেলে ধরতে হয়।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









