এক সময় যেখানে ছিল জমিদারদের রাজকীয় পদচারণা, প্রজাদের আনাগোনা আর বিচার-সালিশের কোলাহল,আজ সেখানে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে জমিদারদের রাজত্ব, বিলীন হয়েছে আভিজাত্যের সেই দিনগুলো। তবে ইতিহাসকে বুকে ধারণ করে এখনো নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পটুয়াখালীর দশমিনার ঐতিহ্যবাহী তালুকদার বাড়ির জামে মসজিদ।
দক্ষিণ উপকূলের শান্ত জনপদ দশমিনার সদর ইউনিয়নের ০২ নং ওয়ার্ডে অবস্থিত এই প্রাচীন স্থাপনাটি আজও অতীতের গৌরবময় ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। শত বছরের পুরোনো মসজিদের দেয়ালে দেয়ালে লেগে আছে জমিদারি আমলের স্মৃতি, ঐতিহ্য আর রাজকীয়তার ছাপ।
তবে তাদের ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়,১৭০০ সালের দিকে মুক্তি মুহাম্মদ শাফি সাহেব এ অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেন এবং জমিদারি প্রথার সূচনা করেন। পরবর্তীতে প্রায় ৬ শতাংশ জমির ওপর গড়ে ওঠে তালুকদার বাড়ির এক গম্বুজবিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন জামে মসজিদ। চুন, সুরকি ও পোড়ামাটির নির্মাণশৈলীতে তৈরি এই মসজিদটি আজও সেই সময়ের শিল্পরুচি ও আভিজাত্যের সাক্ষ্য বহন করছে।

মসজিদের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে এখনো রয়েছে তালুকদার বাড়ির পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ভবন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো বাড়ির কিছু অংশ সংস্কার করে নতুন নতুন ভবন নির্মাণ করা হলেও এখনো টিকে আছে সেই জমিদারি আমলের স্মৃতি। আর মসজিদের দক্ষিণে দেয়াল ঘেঁষেই রয়েছে তালুকদার বাড়ির জমিদারদের কবরস্থান। নীরবে সেখানে শুয়ে আছেন এই জনপদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও রাজকীয় অতীতের সাক্ষী হয়ে থাকা তালুকদার পরিবারের পূর্বপুরুষরা। কবরগুলোর নীরবতা যেন আজও অতীতের হারিয়ে যাওয়া রাজত্বের গল্প বলে যায়।
অন্যদিকে মসজিদের পশ্চিম পাশে প্রায় ১০০ ফুট দূরত্বে ছিল জমিদারদের অন্দরমহল ও বিচার-সালিশের ঘর। একসময় যেখানে বসতো প্রজাদের নানা বিচার, সামাজিক বৈঠক ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আসর। আজ কালের নির্মম আঘাতে সেই বিচার সালিশিঘর প্রায় বিলীনের পথে। ভাঙা দেয়াল আর ধ্বংসস্তূপ যেন নীরবে জানিয়ে দেয় হারিয়ে যাওয়া এক রাজত্বের ইতিহাস।
মসজিদের পূর্ব পাশে রয়েছে সেই পুরোনো রাস্তা, যেই পথে একসময় জমিদাররা চলাফেরা করতেন। একই পথে হেঁটে যেতেন এলাকার সাধারণ মানুষও। সময় বদলেছে, নেই সেই জমিদার, নেই প্রজাদের ব্যস্ততা, কিন্তু পথটি আজও বহন করছে অতীতের স্মৃতি।
স্থানীয়দের মতে, একসময় তালুকদার বাড়িই ছিল এ অঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। জমিদারদের প্রভাবেই এই জনপদে গড়ে উঠেছিল সামাজিক শৃঙ্খলা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ। সেই তালুকদার পরিবারের অন্যতম গর্বিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বাতেন তালুকদার। তাঁর নাম অনুসারেই মসজিদটির নামকরণ করা হয় “তালুকদার বাড়ি জামে মসজিদ।
১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে তালুকদার বাড়ির জৌলুস। একসময় পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে ঐতিহ্যের এই স্থাপনাগুলো। তবে ইতিহাসকে মুছে যেতে দেননি তালুকদার পরিবারের শেষ বংশধররা। নিজেদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার জন্য তারা নিজ উদ্যোগে বারবার সংস্কার করে যাচ্ছেন এই প্রাচীন মসজিদটি।
মসজিদের প্রস্তরলিপি থেকে জানা যায়, ১৯৬৭ সালে এটি সম্প্রসারণ করা হয়। পরে ২০১৩ সালে প্রথম এবং ২০২৪ সালে দ্বিতীয় দফায় সংস্কার করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, এসব সংস্কার কাজ তালুকদার পরিবারের সদস্যরাই নিজেদের উদ্যোগে করেছেন। সরকারি কোনো সহায়তা ছাড়াই তারা পূর্বপুরুষদের ইতিহাস ধরে রাখার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।বর্তমানে এখানে নিয়মিত নামাজ আদায় হয়। পাশাপাশি প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন শতবর্ষী এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি একনজর দেখতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ফলে তরুণ প্রজন্মের কাছেও এটি এখন একটি পরিচিত দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।

মসজিদে নামাজ পড়তে আসা এক মুসল্লি আবুল কাশেম মিয়া বলেন,এই মসজিদ শুধু নামাজ আদায়ের জায়গা নয়, এটা আমাদের এলাকার ইতিহাস আর আবেগের একটা অংশ। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি এখানে কত মানুষ আসতো, কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই মসজিদকে ঘিরে। জমিদারদের সেই রাজত্ব আজ নেই, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া এই মসজিদ এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। পুরোনো দেয়াল আর কারুকাজ দেখলেই মনে হয়, কত ইতিহাস নীরবে কথা বলে যাচ্ছে। তালুকদার পরিবারের শেষ বংশধররা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী মসজিদটা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। আমরা চাই, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও যেন এই ঐতিহ্য আর ইতিহাস কাছ থেকে দেখতে পারে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রাচীন কারুকাজ ও স্থাপনার বিভিন্ন অংশ। তারপরও ইতিহাসের শেষ চিহ্নগুলো আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে তালুকদার বাড়ির মসজিদ। যেন কালের সাক্ষী হয়ে আজও বলে যাচ্ছে,রাজত্ব হারিয়ে গেলেও ইতিহাস কখনো হারিয়ে যায় না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









