একীভূত হওয়া পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংকের গ্রাহকদের বিক্ষোভে এবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জের ব্যাংকিং খাত। ব্যাংকে জমানো টাকা ফেরত না পাওয়া, সীমিত উত্তোলন ব্যবস্থা এবং ‘হেয়ার কাট’ নামে আমানতের মুনাফা কর্তনের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমেছেন হাজারো গ্রাহক ও আমানতকারী।
মঙ্গলবার (১২ মে) সকালে বঙ্গবন্ধু সড়কের নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সামনে জড়ো হয়ে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ভুক্তভোগী আমানতকারী এসোসিয়েশন নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখা এই কর্মসূচি পালন করেন।
একীভূত পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা তাদের আমানত ফিরে পাওয়ার দাবিতে এবার শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জ জেলায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। এ সময় তারা ‘হেয়ার কাট’ পদ্ধতি বাতিল, লেনদেন স্বাভাবিক করা এবং আমানতের টাকা ফেরতের দাবি জানান।
কর্মসূচিতে মো. শহীদুল্লাহ, নাজিম উদ্দিন, ইউসুফ, রানা, ডিউক, তপু সাহা, বিথী, আল আমিনসহ বিপুল সংখ্যক আমানতকারী অংশ নেয়। এ সময় ‘আমার টাকা ফেরত চাই’, ‘হেয়ার কাট মানি না’, ‘আমানত নিয়ে টালবাহানা চলবে না’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন আমানতকারীরা।
অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া আমানতকারীরা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করলেও নির্বাচিত সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তারা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য আমানতের ওপর মাত্র ৪ শতাংশ হারে মুনাফা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা লাখো আমানতকারীকে ক্ষতির মুখে ফেলবে।
তারা আরও অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকগুলোতে তাদের জমাকৃত অর্থ আটকে রয়েছে। প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে না পেরে পরিবার ও ব্যবসা পরিচালনায় চরম সংকটে পড়েছেন তারা।
নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসুচি শেষ করে আমানতকারীরা মিছিল নিয়ে বঙ্গবন্ধু সড়কের আলম কেবিনে সাথে ফাস্ট সিকিউরিটি ব্যাংক, উকিলপাড়ায় ইউনিয়ন ব্যাংক ও টানবাজারে এক্সিম ব্যাংকে গিয়ে ব্যাংক ম্যানেজারের কাছে তাদের সমস্যা সমাধানের আহবান জানান। অন্যথায় যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনার জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দায়ি থাকবে বলে হুশিয়ারী দেয় আমান।
৫টি ব্যাংকগুলো হলো এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এসব ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর মোট ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। এসব ব্যাংকে হেয়ার কাট (মুনাফা কেটে রাখা) বাতিল ও লেনদেন স্বাভাবিক করার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন আমানতকারীরা।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া গ্রাহকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই তারা নিজেদের আমানতের টাকা প্রয়োজন অনুযায়ী তুলতে পারছেন না। কেউ চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে পারছেন না, কেউ ব্যবসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। আবার অনেকে মেয়াদপূর্তির পরও পুরো অর্থ পাচ্ছেন না। এতে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন সাধারণ আমানতকারীরা।
গ্রাহকদের দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ‘হেয়ার কাট’ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাদের বৈধ মুনাফা কেটে নেওয়া হচ্ছে। তারা বলছেন, ব্যাংক পরিচালনায় অনিয়ম ও দুর্নীতির দায় সাধারণ আমানতকারীদের ওপর চাপানো হচ্ছে। ব্যাংকের ক্ষতির জন্য গ্রাহকরা দায়ী নয়, তাই তাদের আমানত থেকে মুনাফা কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত অন্যায্য।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজন আমানতকারী জানান, তারা জীবনের সঞ্চয়, অবসর ভাতা কিংবা ব্যবসার মূলধন এসব ব্যাংকে রেখেছিলেন। এখন সেই টাকা তুলতে না পেরে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, দিনে নির্দিষ্ট সীমার বেশি টাকা তুলতে না পারায় ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এদিকে আন্দোলনকারীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে তারা আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও, মানববন্ধন ও দেশব্যাপী সমন্বিত আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দেশের আর্থিক খাতের জন্য বড় ধরনের অশনিসংকেত। সাধারণ গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সংকট আরও গভীর হতে পারে। বিশেষ করে আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে ব্যাংকিং খাতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









