দেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ঘিরে আবারও ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। চাকরিতে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার নিশ্চিতের দাবিতে প্রকল্প এলাকায় বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে এলাকাবাসী।
মঙ্গলবার (১২ মে) সকালে মাতারবাড়ী ইউনিয়নের সাইরার ডেইল এলাকায় প্রকল্প সংলগ্ন প্রধান সড়কে এই মানবন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। এ সময় সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটেরও সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রুট’স কোম্পানি শ্রমিক নিয়োগে চরম অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিচ্ছে। অর্থের বিনিময়ে স্থানীয় যোগ্য ও অভিজ্ঞ শ্রমিকদের বাদ দিয়ে বাইরের জেলা থেকে লোকজন এনে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রকল্প এলাকার শত শত বেকার যুবক হতাশা ও ক্ষোভে দিন কাটাচ্ছেন।
বিক্ষোভকারীরা জানান, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এলাকার অসংখ্য পরিবার জমি হারিয়েছে। অনেকেই তাদের বসতভিটা, কৃষিজমি ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। উন্নয়নের নামে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেই উন্নয়ন প্রকল্পে চাকরির সুযোগ থেকে স্থানীয়দের বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন মাতারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ আলী মেম্বার, মাতারবাড়ী ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক রফিক উদ্দীন মানিক, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি নাজেম উদ্দীন, শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক আরমানুল ইসলাম আরমান, ছাত্রনেতা সাজেদুল ইসলাম তোফায়েল, হামিদুল হক, হাবিব উল্লাহ, ছেনু আরা বেগম, ইসমত আরা, নুরুজ জাহান ও ফাতেমা বেগমসহ আরও অনেকে।
বক্তারা বলেন, মাতারবাড়ীর মানুষ দেশের উন্নয়নের স্বার্থে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে দিয়েছে। অনেকে পূর্বপুরুষের স্মৃতি বিজড়িত জমি প্রকল্পের জন্য দিতে বাধ্য হয়েছেন। অথচ আজ সেই এলাকার সন্তানদেরই চাকরির জন্য রাস্তায় নামতে হচ্ছে।
তারা বলেন, উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয় যখন সেই উন্নয়নের সুফল স্থানীয় জনগণ ভোগ করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে স্থানীয়রা শুধু ক্ষতিই দেখছে, সুবিধা পাচ্ছে না।
ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলী মেম্বার বলেন, “প্রকল্প শুরুর সময় স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এই প্রকল্প বদলে দেবে মাতারবাড়ীর মানুষের জীবনমান। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি চলছে। টাকার বিনিময়ে বাইরের লোক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের অধিকার কেড়ে নেওয়া হলে জনগণ তা কখনো মেনে নেবে না।”
তিনি আরও বলেন, “এলাকার বহু পরিবার জমি হারিয়ে এখন নিঃস্ব। তাদের ছেলেরা বেকার ঘুরছে। অথচ প্রকল্পে কাজ করছে বাইরের লোক। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত স্থানীয়দের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ না দিলে আরও কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।”
মাতারবাড়ী ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক রফিক উদ্দীন মানিক বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছি। আমাদের দাবি খুবই যৌক্তিক। মাতারবাড়ীর মানুষ উন্নয়নের জন্য সবকিছু বিসর্জন দিয়েছে। কিন্তু আজ তারা উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত। যদি দ্রুত সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।”
শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক আরমানুল ইসলাম আরমান বলেন, “স্থানীয় শ্রমিকদের বাদ দিয়ে বাইরের শ্রমিক এনে কাজ করানো হচ্ছে। এতে এলাকার যুবসমাজ হতাশ হয়ে পড়ছে। আমরা চাই স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং স্থানীয়দের জন্য নির্দিষ্ট কোটা নিশ্চিত করা হোক।”
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া নারী সদস্যরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ছেনু আরা বেগম বলেন, “আমাদের পরিবারের পুরুষরা বেকার। প্রকল্পের জন্য জমি গেছে, ঘর গেছে। কিন্তু চাকরি পায় অন্য এলাকার লোকজন। আমরা কি শুধু কষ্টই সহ্য করবো?”
ইসমত আরা বলেন, “উন্নয়নের কথা বলে আমাদের অনেক স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে আমরা কিছুই পাইনি। আমাদের সন্তানদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।”
বিক্ষোভ চলাকালে কয়েক ঘণ্টা প্রকল্প এলাকার প্রধান সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে স্থানীয় প্রশাসনের আশ্বাসে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে অবরোধ তুলে নেয় আন্দোলনকারীরা। তবে তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দাবি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়া হলে আগামীতে লাগাতার কর্মসূচি, গেইট অবরোধ এবং বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, মাতারবাড়ী প্রকল্প দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্থানীয় জনগণের স্বার্থ ও অধিকার উপেক্ষা করা হলে সামাজিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত স্থানীয়দের অভিযোগ খতিয়ে দেখে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং প্রকল্প এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কর্মসংস্থানের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









