শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

জলদস্যুর ভয়ে সাগর ছাড়লেন জেলেরা, তীরে হানা দিল অভাব

প্রকাশিত: ১৪ মে ২০২৬, ০১:২৫ পিএম

আপডেট: ১৪ মে ২০২৬, ০১:২৫ পিএম

জলদস্যুর ভয়ে সাগর ছাড়লেন জেলেরা, তীরে হানা দিল অভাব

বাংলাদেশের উপকূলজুড়ে বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর শুধু অর্থনীতির নয়, হাজারো জেলে পরিবারের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। অথচ সেই সাগরেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ শিকার করা সাতক্ষীরার উপকূলীয় জেলেদের বড় একটি অংশ আজও সরকারি সহায়তার বাইরে রয়ে গেছে। নিবন্ধিত জেলেরা খাদ্য সহায়তা পেলেও জেলার লক্ষাধিক অনিবন্ধিত জেলে পরিবার কাটাচ্ছে চরম অনিশ্চয়তা ও অর্থকষ্টে।

 বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে উপকূল থেকে ৮০-৯০ কিলোমিটার গভীরে মাছ ধরতে যান সাতক্ষীরার হাজারো জেলে। ঝড়, জলদস্যু আর বৈরী আবহাওয়ার ঝুঁকি নিয়েই চলে তাদের জীবনযুদ্ধ। সমুদ্র থেকে ফিরে রূপচাঁদা, ভোল কিংবা লইট্যা মাছ বাজারে কোটি টাকার বাণিজ্য তৈরি করলেও, সেই মাছ আহরণকারী জেলেদের বড় অংশের জীবন কাটে অনিশ্চয়তা আর অভাবের মধ্যে। সাতক্ষীরার প্রায় ৪৯ হাজার নিবন্ধিত জেলের শ্যামনগর, আশাশুনি ও তালা উপজেলার একটি বড় অংশ সরাসরি গভীর সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল। তবে নিবন্ধিত জেলেদের বাইরেও জেলায় প্রায় লক্ষাধিক অনিবন্ধিত জেলে রয়েছেন, যারা এই নিষেধাজ্ঞার সময়ে কোনো ধরণের সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন না। ফলে এই বিশাল জনগোষ্ঠী বর্তমানে চরম অর্থনৈতিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে।

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সামুদ্রিক মৎস্য বিধিমালা ২০২৩ অনুযায়ী ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এই সময়ে সমুদ্রগামী নৌযান দিয়ে যেকোনো প্রজাতির মাছ ধরা দ-নীয় অপরাধ। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হলে কর্মহীন হয়ে পড়ে উপকূলের জেলেপাড়াগুলো।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা জেলায় বর্তমানে মোট নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪৯ হাজার জন। এই জেলেদের মধ্যে ১২ হাজার ৮৮৯ জন গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। এর মধ্যে শ্যামনগর উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যার সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার ৩৫৫ জন। আশাশুনি উপজেলায় ৪ হাজার ৫৫৫ জন এবং তালা উপজেলায় ৯৭৯ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা জেলেদের মধ্যে বর্তমানে ১২ হাজার ৮৭৯ জন ভিজিএফ বা খাদ্য সহায়তা পাচ্ছেন। মাছ ধরা বন্ধ থাকাকালীন ৫৮ দিনের জন্য নিবন্ধিত জেলেদের জনপ্রতি মোট ৭৭.৩৩ কেজি করে বিশেষ ভিজিএফ চাল প্রদান করা হচ্ছে।

মৎস্য বিভাগ ও ট্রলার মালিকদের মতে, নিবন্ধিত ছাড়াও শ্যামনগরে আরও ৪০ হাজার, আশাশুনিতে ২০ হাজার এবং তালা ও কালিগঞ্জে আরও কয়েক হাজার অনিবন্ধিত জেলে রয়েছেন, যারা দীর্ঘ বছর ধরে এই পেশায় থাকলেও তালিকার বাইরে রয়ে গেছেন।

নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে শ্যামনগর, আশাশুনি ও তালার জেলেপাড়াগুলোতে এখন শুধুই হাহাকার। কর্মহীন জেলেদের অলস সময় কাটছে ঘাটে বাঁধা নৌকার পাহারায়, আর চোখেমুখে অনিশ্চয়তার ছাপ।

গভীর সমুদ্রে যাওয়া জেলে আশাশুনির উপজেলার প্রতাপনগরেরর শাহজাহান বলেন, আমরা প্রতি বছর প্রায় পাঁচ মাসের জন্য দুবলার চরে অবস্থান করি। আমরা মূলত গভীর সমুদ্রের জেলে; উপকূল থেকে প্রায় ৮০-৯০ কিলোমিটার ভেতরে গিয়ে আমরা মাছ শিকার করি। আমাদের জালে ছুরি, লইট্যা, চেলা, ভোল, মেদ, রূপচাঁদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির যে মাছই ধরা পড়ে, তার সবটুকুই আমরা চরে এনে শুঁটকি করি। কিন্তু মৌসুম শেষে আমাদের ধার করে সংসার চালাতে হয়। দীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমাদের জীবন কাটছে ঋণ আর দাদনের ওপর।

তিনি আরও বলেন, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। বর্তমানে আমাদের বড় আতঙ্কের নাম জলদস্যু। গত বছরের তুলনায় এই বছর সমুদ্রে ডাকাতির উপদ্রব অনেক বেশি বেড়ে গেছে। এই ডাকাতি নির্মূল করা গেলে আমরা সাধারণ জেলেরা অনেক বেশি নির্ভয়ে এবং সুস্থভাবে কাজ করতে পারতাম।
তিনি আরো বলেন, সমুদ্রে এমন কিছু দামী মাছ পাওয়া যায় যার মূল্য অনেক। যেমন ভোল মাছ; এক কেজি ভোল মাছ প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। আমাদের সংগৃহীত এসব মাছ চরেই বিক্রি হয়, এছাড়া চট্টগ্রাম, খুলনা, আশাশুনির মহেস্বরকাঠি, মুন্সিগঞ্জ বা কয়রার ব্যবসায়ীরাও এসে আমাদের কাছ থেকে মাছ নিয়ে যান।

তিনি আরো বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় সরকার থেকে আমাদের যে চাল দেওয়ার কথা, যাদের কার্ড আছে তারা তা পাচ্ছেন। তবে বছরের সব সময় আমরা সাগরে থাকতে পারি না। বিশেষ করে আবহাওয়া যখন খারাপ হয়, তখন সমুদ্রে যে পরিমাণ ঢেউ বা রোলিং শুরু হয়, তাতে জান নিয়ে টানাটানি পড়ে যায়। বৈরী আবহাওয়ার কারণে তখন আমাদের পক্ষে সাগরে টিকে থাকতে অসম্ভব হয়ে পড়ে।

শ্যামনগর উপজেলার দাতিনাখালী গ্রামের জেলে আজগর আলী বলেন, টানা ৫৮ দিন সাগরে যাওয়া বন্ধ থাকলে আমাদের চরম অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়তে হয়। সরকারের দেওয়া চাল কিছুটা স্বস্তি দিলেও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রতাপনগর এলাকার আরেক জেলে তৌহিদ হোসেন বলেন, আমরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাই, কিন্তু মাছের ন্যায্যমূল্য পাই না। উপকূলে ফিরে আসার পর আমাদের হাতে কোনো কাজ থাকে না। সরকার থেকে যে চাল দেওয়া হয়, তা দিয়ে জীবন চালানো দুষ্কর। শুধু তো চাল দিয়ে হয় না, আনুষঙ্গিক তরিতরকারি কেনার সামর্থ্যও আমাদের নেই। অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে আমাদের একেকটি দিন কাটছে।

মানবাধিকার কর্মী মাধব দত্ত বলেন, শুধু চাল দিলেই একটি মৎস্যজীবী সংসার চলে না। চালের সাথে তেল, নুন, ডাল ও শাকসবজির মতো অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর জন্য তাদের নগদ অর্থ সহায়তা প্রয়োজন। বর্তমানের অগ্নিমূল্যের বাজারে সরকারের উচিত চালের পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারকে অন্তত ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা নগদ প্রদান করা।

তিনি আরো বলেন, মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকার সময়ে জেলেরা সম্পূর্ণ বেকার হয়ে পড়ে। এই অবকাশকালীন সময়ে তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে মৎস্যজীবী-বান্ধব ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তুললে তারা এই অলস সময়ে কাজ করার সুযোগ পাবে। এছাড়া জেলে পরিবারের নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। পর্যাপ্ত সহায়তার অভাবে এই মানুষগুলো মানবেতর জীবনযাপন করে, যার ফলে অনেক সময় তারা নিরুপায় হয়ে জলদস্যু-বনদস্যুসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ে। তাই তাদের মৌলিক অধিকার রক্ষা ও পুনর্বাসনের জন্য সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আব্দুর রউফ বলেন, আমাদের এলাকা থেকে আনুমানিক ১২০০ থেকে ১২৫০ জন জেলে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। সমুদ্রগামী জেলেরা সরকারিভাবে চালের বরাদ্দ পেলেও সেটি তাদের প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য; জেলেরা মাত্র ৫৬ থেকে ৭৭ কেজির মতো চাল পান, যা দিয়ে তাদের বিশাল খরচ মেটানো সম্ভব হয় না। সমুদ্রগামী জেলেরা কিছুটা পেলেও আর বেশিরভাগ জেলে কোনো সহায়তা পায়ই না। জেলেরা মূলত লইট্টা, চিংড়ি, ফেশা ও ছুরি মাছ ধরেন, যা খুলনা হয়ে সরাসরি চট্টগ্রামের ফিশারিঘাটে চলে যায়। তবে জেলেরা যখন স্থানীয়ভাবে মাছ বিক্রি করেন, তখন তারা মোটেও ন্যায্যমূল্য পান না।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে জেলেদের জন্য সবচাইতে বড় আতঙ্কের নাম হলো জলদস্যু। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলে মইন বাহিনী বা জাহাঙ্গীর বাহিনীর মতো জলদস্যুরা জেলেদের ধরে নিয়ে যায়। একেকজন জেলেকে ছাড়িয়ে আনতে তারা ২ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করে। এই জলদস্যুদের অত্যাচারে আমাদের জেলেরা আজ দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

সাতক্ষীরার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জিএম সেলিম বলেন, সাতক্ষীরা জেলার বিশাল এক জনগোষ্ঠী মৎস্য আহরণের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে আমাদের তালিকাভুক্ত ৪৯ হাজার জেলের মধ্যে একটি বড় অংশ গভীর সমুদ্রে এবং উপকূলীয় নদ-নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। বিশেষ করে সরকারি নির্দেশনায় যখন মাছ ধরা বন্ধ থাকে, তখন আমরা জেলেদের খাদ্য সহায়তা হিসেবে চাল দিয়ে থাকি। তবে আমরা অনুভব করছি যে, শুধুমাত্র চাল দিয়ে একটি পরিবারের সম্পূর্ণ ভরণপোষণ কঠিন। তাই আমরা ঊর্ধ্বতন মহলে প্রস্তাব পাঠিয়েছি যাতে চালের পাশাপাশি ডাল, তেল বা আলুর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যও এই সহায়তার আও্যতা আনা যায়।

তিনি আরও বলেন, জেলেদের স্বাবলম্বী করতে আমরা বিকল্প কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা গ্রহণ করছি। এছাড়া সমাজসেবা, সমবায় বা মহিলা বিষয়ক দপ্তরের মতো সরকারি অন্যান্য বিভাগগুলো যদি তাদের সেফটি নেটের আওতায় এই জেলেদের ভাগ করে নিয়ে সহায়তা করে, তবে তাদের দারিদ্র্য বিমোচন আরও দ্রুত সম্ভব হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকারি পুকুর ইজারা। জেলে সমিতিগুলো যদি স্বচ্ছতার সাথে এই পুকুরগুলোর ইজারা পায়, তবে জেলেদের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। আমরা চেষ্টা করছি আমাদের নিবন্ধিত জেলেরা যেন নিয়মিত সুযোগ-সুবিধা পায় এবং পর্যায়ক্রমে আরও বেশি সংখ্যক জেলেকে সহায়তার আওতায় আনা যায়। পর্যায়ক্রমে অনিবন্ধিত জেলেদেরও সহায়তার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

আ/সা/কাও

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.