এক সময় সন্ধ্যা নামলেই সদরঘাট থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা কিংবা ঝালকাঠিগামী লঞ্চে উঠতে হতো ধাক্কাধাক্কি করে। কেবিনের টিকিট মিলত না দিনের পর দিন। ডেক ভর্তি যাত্রী, হকারদের হাঁকডাক আর নদীর বুকে আলোকিত লঞ্চ, এসবই ছিল দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের নিত্যদিনের পরিচিত দৃশ্য।
কিন্তু পদ্মা সেতু চালুর পর সেই চিত্র এখন অনেকটাই স্মৃতি। যাত্রী সংকট আর টানা লোকসানে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের নৌরুট। বহু লঞ্চ অলস পড়ে আছে ডকইয়ার্ডে। কেউ বিক্রি করে দিচ্ছেন, আবার কেউ শেষ ভরসা হিসেবে কেটে ফেলছেন কোটি টাকার লঞ্চ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত কয়েক বছরে ঢাকায় অন্তত পাঁচটি লঞ্চ স্ক্র্যাপ হিসেবে কেটে বিক্রি করা হয়েছে। বর্তমানে আরও কয়েকটি লঞ্চ একই পরিণতির অপেক্ষায় রয়েছে।
২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর দেশের দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসে। আগে নৌপথে ঢাকা পৌঁছাতে পুরো একটি রাত লেগে যেত। এখন সড়কপথে মাত্র তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই রাজধানীতে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে দ্রুত ও সহজ যাতায়াতের কারণে যাত্রীরা ক্রমেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন নৌপথ থেকে।
লঞ্চ মালিকদের দাবি, বর্তমানে মূলত অসুস্থ, বয়স্ক কিংবা দীর্ঘ সড়ক ভ্রমণে অস্বস্তিবোধ করেন এমন যাত্রীরাই লঞ্চে চলাচল করছেন। এতে অধিকাংশ লঞ্চেই দেখা দিয়েছে ভয়াবহ যাত্রী সংকট।
এক সময় ব্যস্ততম ঢাকা-বরিশাল নৌরুটে নিয়মিত ২৬ থেকে ২৮টি লঞ্চ চলাচল করত। রাত হলেই সদরঘাট ও বরিশাল লঞ্চঘাটে সৃষ্টি হতো উৎসবমুখর পরিবেশ। অথচ এখন প্রতিদিন রোটেশন পদ্ধতিতে মাত্র দুই থেকে তিনটি লঞ্চ চলাচল করছে। তাতেও অনেক সময় পর্যাপ্ত যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না।
ঢাকা-বরিশাল রুটের এক লঞ্চ মালিক বলেন, “এক সময় লঞ্চে জায়গা পাওয়া ছিল কষ্টকর। এখন যাত্রীই পাওয়া যায় না। জ্বালানি খরচ, স্টাফদের বেতন আর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেকে লঞ্চ বিক্রি করছেন, কেউ আবার স্ক্র্যাপ বানিয়ে দিচ্ছেন।”
লঞ্চ চলাচল কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িত হাজারো শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকাও এখন হুমকির মুখে।
বরিশাল লঞ্চঘাটের মালটানা শ্রমিক ফজলু বলেন, “আগে দিন-রাত লঞ্চ আসত। মালটেনে সংসার ভালো চলতো। এখন লঞ্চই কমে গেছে, কাজও নাই। বাধ্য হয়ে অন্য কাজ খুঁজতে হচ্ছে।”
একই আক্ষেপ ভ্রাম্যমাণ পণ্য বিক্রেতা সালামের কণ্ঠেও, “আগে লঞ্চ ছাড়ার সময় এমন ভিড় হতো যে হাঁটার জায়গা পাওয়া যেত না। তখন ভালো বিক্রি হতো। এখন যাত্রী কমে গেছে, বিক্রিও নেই। দিন দিন অবস্থা খারাপ হচ্ছে।”
সংশ্লিষ্টরা জানান, যেসব লঞ্চ এখনো বিক্রি করা হয়নি, সেগুলোর বেশিরভাগই দীর্ঘদিন ধরে ডকইয়ার্ডে পড়ে রয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়তে থাকায় লোকসানও বাড়ছে। ফলে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সেগুলোকেও স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করে দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে যাত্রীরা মনে করেন, লঞ্চ শুধু একটি পরিবহন মাধ্যম নয়, এটি দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্য, আবেগ ও সংস্কৃতির অংশ।
যাত্রী আনোয়ার হোসেন বলেন, “পদ্মা সেতুর কারণে এখন দ্রুত ঢাকা যাওয়া যায়, তাই সময় বাঁচাতে মানুষ সড়কপথ বেছে নিচ্ছে। কিন্তু লঞ্চ ভ্রমণের যে আরাম, সৌন্দর্য আর অনুভূতি, তা অন্যকোনো পরিবহনে পাওয়া যায় না। এই শিল্পটা বাঁচিয়ে রাখা দরকার।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, নৌপথ সংকুচিত হয়ে পড়লে শুধু একটি পরিবহন খাত নয় বরং এর সঙ্গে জড়িত হাজারো মানুষের জীবিকাও চিরতরে হুমকির মুখে পড়বে। তাই ঐতিহ্যবাহী লঞ্চ শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারি প্রণোদনা, আধুনিকায়ন, নিরাপদ সেবা নিশ্চিতকরণ এবং নৌপথকেন্দ্রিক দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









