সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল ঘোষণার উদ্যোগ দীর্ঘদিনের একটি প্রত্যাশিত পদক্ষেপ। ২০১৫ সালের পর আর নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়ন হয়নি। এ সময়ে মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন- এ নিয়ে দ্বিমত নেই। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর বেতন-ভাতা পর্যালোচনার বিধান থাকলেও গত এক দশকে তা বাস্তবায়িত হয়নি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন পে-স্কেলের উদ্যোগ যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্ত কতটা টেকসই এবং এর প্রভাব কী হতে পারে? বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা সাড়ে ১৪ লাখের কিছু বেশি, অথচ মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ করছে বেসরকারি খাত, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি কিংবা আত্মকর্মসংস্থানে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি হলেও এই বিশাল জনগোষ্ঠীর আয়ে সমপরিমাণ কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। ফলে আয় বৈষম্য আরও বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগও এখানেই। যখন মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, তখন বাজারে অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ সৃষ্টি হলে পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়বে। কিন্তু উৎপাদন ও সরবরাহ একই হারে না বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু বেতন বৃদ্ধির খবর ছড়ালেই একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কিংবা অযৌক্তিকভাবে নিত্যপণ্যের দাম, পরিবহন ভাড়া ও বাসাভাড়া বাড়িয়ে দেয়। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ, যাদের আয় অপরিবর্তিত থাকে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো অর্থের জোগান। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হবে। রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়লে সরকারকে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। দেশীয় ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমতে পারে এবং তারল্যসংকট দেখা দিতে পারে। আবার অতিরিক্ত অর্থ ছাপানোর পথ বেছে নিলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। অর্থাৎ পরিকল্পনাহীন বাস্তবায়ন অর্থনীতিকে নতুন চাপের মুখে ফেলতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয়, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি বন্ধ রাখতে হবে। বরং প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত কৌশল। সরকার যদি ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধি করে, একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়ায়, বাজার তদারকি জোরদার ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়, তাহলে মূল্যস্ফীতির চাপ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য খাদ্য ও অন্যান্য ভর্তুকি বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনমান উন্নয়ন নয়, দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। নতুন পে-স্কেল যদি কেবল একটি সীমিত জনগোষ্ঠীর জন্য স্বস্তি বয়ে আনে, কিন্তু তার বিনিময়ে কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যায়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের কাঙ্ক্ষিত সুফল প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
সরকারের উচিত নতুন পে-স্কেলকে শুধুমাত্র বেতন বৃদ্ধির কর্মসূচি হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। রাজস্ব বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের মাধ্যমে যদি এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যথায়, নতুন পে-স্কেল সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সাময়িক স্বস্তি আনলেও সামগ্রিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, বৈষম্য ও আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









