নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দীর্ঘদিন ধরে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের আয়ের তুলনায় খাদ্য ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, একটি সামাজিক সমস্যায়ও পরিণত হয়েছে। এমন বাস্তবতায় খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণ ও সমাধান নিয়ে নীতিনির্ধারক, গবেষক এবং ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত সংলাপে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষকের কাছ থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম ৫০ থেকে ১১৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এ তথ্য স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন ধাপে অস্বাভাবিক মূল্য সংযোজন ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব এখনো বড় সমস্যা। এ ক্ষেত্রে কৃষকের প্রকৃত লাভ নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই।
উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি উচ্চ সুদের ঋণ, প্রাকৃতিক ঝুঁকি, দীর্ঘসময় পুঁজি আটকে থাকা এবং পারিবারিক ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় নিলে কৃষকের প্রকৃত মুনাফা অনেক কমে যায়। ফলে বাজারে উচ্চমূল্যের সুবিধা কৃষকের পরিবর্তে অন্যরা বেশি ভোগ করে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৃষকদের কাছে বাজারসংক্রান্ত সঠিক তথ্যের অভাব। কোন পণ্যের চাহিদা কত, কোন ফসলে লাভের সম্ভাবনা বেশি কিংবা উৎপাদনের পরিকল্পনা কীভাবে করা উচিত—এসব তথ্য সময়মতো না পৌঁছানোর কারণে অনেক সময় একই ফসল অতিরিক্ত উৎপাদিত হয়, আবার অন্য পণ্যের ঘাটতি তৈরি হয়।
এর ফলে একদিকে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, অন্যদিকে ভোক্তাকেও অস্থিতিশীল বাজারের খেসারত দিতে হয়। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে লজিস্টিক ব্যয়, উৎপাদন ব্যয় এবং অনিয়ন্ত্রিত বা হিসাববহির্ভূত ব্যয় কমাতে হবে। কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত ব্যয়, চাঁদাবাজি, অদক্ষ পরিবহনব্যবস্থা এবং তথ্যের ঘাটতি পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। এসব ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় সাধারণ ভোক্তাকেই।
সরবরাহ ব্যবস্থায় ট্রেসেবিলিটি চালুর সরকারি উদ্যোগ ইতিবাচক। এর মাধ্যমে পণ্যের উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনের প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করা গেলে কোথায় অস্বাভাবিক ব্যয় বা মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে তা সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পরিবহনব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, রেলপথে কৃষিপণ্য পরিবহনের সুযোগ বৃদ্ধি, সংরক্ষণাগার সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল বাজারতথ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলাও সময়ের দাবি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু বাজার তদারকি নয়, প্রয়োজন একটি সমন্বিত নীতি। উৎপাদক, পরিবেশক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তার স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। হিসাববহির্ভূত ব্যয়, অবৈধ চাঁদাবাজি এবং অদক্ষ সরবরাহব্যবস্থার অবসান ঘটানো গেলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন, ভোক্তাও সহনীয় দামে পণ্য কিনতে পারবেন। মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে এ ধরনের বাস্তবমুখী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আর কোনো বিকল্প নেই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









