ব্যাংকের ভল্টে কোটি কোটি টাকা রাখা থাকে জনগণের আমানত হিসেবে। সেই টাকা পাহারা দেওয়ার জন্য থাকে কর্মকর্তা, হিসাবরক্ষণব্যবস্থা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, নিরীক্ষা এবং নানা স্তরের তদারকি। তারপরও যদি ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে প্রশ্নটি শুধু টাকা আত্মসাতের নয়- প্রশ্নটি পুরো ব্যবস্থার সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিয়ে।
অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির চট্টগ্রামের লালদীঘি (পূর্ব) করপোরেট শাখায় ঘটে যাওয়া ঘটনাটি তাই গভীর উদ্বেগের। অভিযোগ অনুযায়ী, এক হাজার টাকার নোটের বান্ডিলের ওপর ও বাইরে এক হাজার টাকার নোট রাখা হলেও বান্ডিলের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো ১০০ টাকা বা তার কম মূল্যমানের নোট। বাইরে থেকে দেখে মনে হতো, পুরো বান্ডিলই এক হাজার টাকার নোটে পূর্ণ। এই কৌশলে ভল্টে থাকা প্রকৃত অর্থের পরিমাণ আড়াল করে কোটি কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটি নিছক একজন কর্মীর প্রতারণা নয়; বরং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতার প্রমাণ। কারণ, কোটি কোটি টাকা এক দিনে ভল্ট থেকে উধাও হয়ে যায়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, টাকা ধাপে ধাপে সরানো হয়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে এমন একটি প্রক্রিয়া চলেছে, অথচ সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের নজরদারি তা শনাক্ত করতে পারেনি।
সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের জায়গা এখানেই। ব্যাংকের প্রতিদিনের লেনদেন শেষে নগদ অর্থের হিসাব মেলানোর নিয়ম রয়েছে। ভল্টে কত টাকা থাকার কথা এবং বাস্তবে কত টাকা আছে- এই হিসাব ব্যাংকিং ব্যবস্থার মৌলিক নিয়ন্ত্রণের অংশ। তাহলে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঘাটতি কীভাবে এত দিন অদৃশ্য থাকল? হিসাব মিলেছে কীভাবে? নগদ অর্থ যাচাইয়ের সময় বান্ডিলের ভেতরের নোট পরীক্ষা করা হয়নি কেন? একাধিক কর্মকর্তা ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি নিয়ম অনুযায়ী যাচাই করে থাকেন, তাহলে এই অনিয়ম শনাক্ত হলো না কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু সংশ্লিষ্ট শাখার জন্য নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য জরুরি।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উদ্বেগের। মামলার নথি অনুযায়ী, আত্মসাৎ করা অর্থ ব্যবসায় বিনিয়োগ করে গরুর খামার গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ এটি কোনো আকস্মিক সুযোগ নিয়ে করা এককালীন অপরাধের চিত্র নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে অর্থ সরিয়ে তা অন্যত্র ব্যবহার করার অভিযোগ সামনে এসেছে। এর অর্থ হলো, অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ যদি সত্যিই এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে থাকেন, তবে তাঁদের একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসা উচিত। তবে তদন্তের স্বার্থে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি- অভিযোগ, জবানবন্দি কিংবা মামলার নথিতে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে চূড়ান্তভাবে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না। আদালতের বিচারেই অপরাধের চূড়ান্ত সত্য নির্ধারিত হবে। কিন্তু সেই বিচারিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ব্যাংকের প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রণগত ব্যর্থতার প্রশ্নটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে এখন নিজেদের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাগুলোও খুঁজে বের করতে হবে। কোথায় নিয়ন্ত্রণ ভেঙেছে, কোন স্তরে তদারকির ঘাটতি ছিল এবং ভবিষ্যতে একই কৌশলে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ বন্ধ করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে- তা স্পষ্ট করা দরকার। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট শাখার পাশাপাশি একই ধরনের ঝুঁকিতে থাকা অন্যান্য শাখাতেও বিশেষ অডিট পরিচালনা করা উচিত। বিশেষ করে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় শুধু কাগজে-কলমে হিসাব মেলানো যথেষ্ট নয়। ব্যাংকের অর্থ মানে জনগণের অর্থ।
একজন গ্রাহক তাঁর কষ্টার্জিত টাকা ব্যাংকে রাখেন এই বিশ্বাসে যে সেটি নিরাপদ। সেই বিশ্বাসের ভিত্তিই যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে ক্ষতি শুধু ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা। তাই এই ঘটনার তদন্ত হতে হবে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও গভীরভাবে। শুধু কত টাকা কোথায় গেছে, সেটি খুঁজে বের করাই যথেষ্ট নয়; কীভাবে টাকা বের হলো, কেন এত দিন ধরা পড়ল না এবং কারা এর সুযোগ করে দিল- অনেক প্রশ্ন, কিন্তু উত্তর কোথায়?
ব্যাংকের ভল্টে শুধু টাকা থাকে না- থাকে মানুষের আস্থা। সেই আস্থার পাহারায় সামান্যতম ফাঁকও বিপজ্জনক। ভল্টের টাকা উদ্ধার করা এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হলো এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে কোটি কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার আগে কিংবা সরানোর সঙ্গে সঙ্গেই সতর্কসংকেত বেজে উঠবে। সর্বোপরি, জনগণের টাকা ও তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









