ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রথম ও সবচেয়ে শক্তিশালী বহুজাতিক কর্পোরেশন। আধুনিক কর্পোরেট ব্যবসায়ী শাসন ব্যবস্থা (কর্পোরেট গভর্ন্যান্স) এবং তাদের সিন্ডিকেট রাজনীতির সাথে অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কার্যপ্রণালীর একাধিক গভীর ও যৌক্তিক সাদৃশ্য রয়েছে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে বর্তমান কর্পোরেট শাসন ব্যবস্থা ও সিন্ডিকেট ব্যবস্থার প্রধান যৌক্তিক সামঞ্জস্যগুলো হলো একচেটিয়া বাজার আধিপত্যের লক্ষ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৬০০ সালে একটি রাজকীয় সনদ নিয়ে যাত্রা শুরু করে, যার ফলে তাদের এশিয়ার সাথে বাণিজ্যে একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আইনি অধিকার ছিল। বর্তমান বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাজার দখল ও ছোট প্রতিদ্বন্দ্বীদের কিনে নিয়ে একচেটিয়া বা অল্প কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ গড়ে তোলে।
ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্যদের শেয়ার প্রদান, ঘুষ এবং আর্থিক সুবিধা দিয়ে তাদের পক্ষে আইন প্রণয়নকরত পরবর্তীতে তারা সরাসরি বাংলা ও ভারতের রাজস্ব ও প্রশাসন দখল করে নেয়। অনুরূপ আধুনিক বড় বড় কর্পোরেশনগুলো লবিং, রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনৈতিক তহবিল প্রদান এবং নীতি-নির্ধারকদের নিজেদের পক্ষে প্রভাবিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় আইন ও নীতি নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার তাঁতি এবং কৃষকদের ওপর বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছিল বলে কৃষকরা শুধু কোম্পানির কাছেই নির্দিষ্ট মূল্যে নীল, রেশম বা সুতা বিক্রি করতে বাধ্য হতো। ফলে, খোলা বাজারের প্রতিযোগিতা ধ্বংস হয়ে সিন্ডিকেট তৈরি হয়। বর্তমানেও বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও আমদানিকারকরা নিজেদের মধ্যে একজোট হয়ে সরবরাহ শিকল ব্যবস্থা ও পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ইচ্ছেমতো দাম বাড়ায়।
১৭৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় যখন বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছিল, তখনও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কঠোরভাবে রাজস্ব আদায় অব্যাহত রেখেছিল এবং শস্য রপ্তানি বজায় রেখেছিল। বর্তমানে অনেক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি, শ্রমিক শোষণ বা স্বাস্থ্যঝুঁকিকে তোয়াক্কা না করে শুধুমাত্র ত্রৈমাসিক লভ্যাংশ ও শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফা বৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করে।
আরো দেখা যায়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজস্ব সামরিক বাহিনী গঠন করে রাজ্য জয় করত এবং ব্যবসা জোরপূর্বক টিকিয়ে রাখত। বর্তমানে সামরিক শক্তি প্রয়োগ না করলেও কর্পোরেশনগুলো বিশাল আইনি দল, তথ্য উপাত্ত বা ডেটা প্রাইভেসি নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল এলগরিদম এবং প্রভাব বিস্তারকারী মিডিয়া ও প্রাইভেট সিকিউরিটি এজেন্সির মাধ্যমে নিজস্ব ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে। মূলত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছিল রাষ্ট্রহীন এক অপরিসীম ক্ষমতার কর্পোরেট মডেল। আজকের বিশ্বের প্রভাবশালী কর্পোরেট সিন্ডিকেটগুলোও প্রত্যক্ষ সামরিক শাসনের বদলে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে একইভাবে বাজার ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করছে।
আর এরই ফলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মতো স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত ক্ষেত্রগুলোকে বসুন্ধরার মতো বৃহৎ কর্পোরেট গ্রুপিং বা প্রাইভেট কনগ্লোমারেটের হাতে তুলে দেওয়া সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলোর পেছনে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি, কৌশলগত সুবিধা এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক কাজ করে। তাই বিভিন্ন বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ধরণনর পদক্ষেপের পেছনে সরকারের সম্ভাব্য চালিকাশক্তি এবং কৌশলগুলো প্রধানত কয়েকটি বিষয়ে বিভক্ত। তার মধ্যে অন্যতম হলো রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ঘাটতি ও ভর্তুকি কমানোর কৌশল করতে গিয়ে তারা তহবিল সংকটে ভোগে।
জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা (ডলার) ও ভর্তুকি প্রয়োজন হয়। বিপিসি বা পিডিবি-র ওপর চাপ কমাতে সরকার বেসরকারি খাতকে আমদানির সুযোগ দিয়ে নিজেদের তাৎক্ষণিক আর্থিক দায়ভার এড়াতে চায়। কর্পোরেট অর্থায়নে বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক ব্যবস্থার সাথে নিজস্ব সম্পর্ক ও ঋণ নেওয়ার বড় সক্ষমতা থাকায়, সরকার মনে করে তারা নিজস্ব অর্থায়নে বিশাল সাপ্লাই চেইন বজায় রাখতে পারবে। ক্রনি ক্যাপিটালিজম বা তোষণমূলক পুঁজিবাদ রাজনৈতিক ও আর্থিক আঁতাতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বড় বড় কর্পোরেট হাউসগুলো সরকারের জন্য অর্থায়ন, মিডিয়া কভারেজ এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে ভূমিকা রাখে। ফলে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ ও একচেটিয়া লাভের সুবিধা দিতে নীতি-নির্ধারণী ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়।
এর ফলে ইনডেমনিটি ও বিশেষ আইনে অতীতে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’-এর মতো আইনের প্রয়োগ দেখা গেছে, যার মাধ্যমে দরপত্র ছাড়া সরাসরি কাজ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। আর এ ধরনের আইনি সুবিধাগুলো নির্দিষ্ট কর্পোরেটদের সুবিধা দেওয়ার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শুধু তাই নয়, কৌশলগত খাতের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা দাম নির্ধারণের ক্ষমতা হস্তান্তরে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিপিসির নিয়ন্ত্রণে থাকলে জ্বালানির দাম সরাসরি সরকারের সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতায় থাকে। কিন্তু একটি বড় প্রাইভেট সিন্ডিকেটের হাতে বিপণন ও আমদানির বাজার গেলে তা প্রাইভেট কার্টেল বা অলিগোপলিতে পরিণত হতে পারে, যা পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষের খরচ বাড়িয়ে দেয়।
তাই জ্বালানি খাত একটি দেশের নিরাপত্তামূলক অবকাঠামো বলে এটি যদি ১-২টি প্রাইভেট গ্রুপের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে তারা সরকারকে নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘ব্ল্যাকমেইল’ বা প্রভাবিত করার মতো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। ফলে, বসুন্ধরা গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বিটুমেন প্ল্যান্ট, শিপিং, স্টিল মিলসহ বিভিন্ন বড় শিল্প খাত রয়েছে যার জন্য তাদের প্রচুর জ্বালানি লাগে। নিজস্ব সাপ্লাই চেইন ব্যবহারের অজুহাতে তারা আমদানির অনুমতি নেয়, যা পরবর্তীতে মূল জাতীয় বাজার দখলের ভিত্তি তৈরি করে।
অতএব সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে ‘বাজার প্রতিযোগিতামূলক করা’ বা ‘অবকাঠামোগত দক্ষতা বাড়ানো’-র অযুহাতে তুলে ধরলেও, নীতিগত স্বচ্ছতা ও উন্মুক্ত দরপত্রের অভাবের কারণে এই প্রক্রিয়াকে প্রায়শই নির্দিষ্ট কর্পোরেট গ্রুপকে সুবিধা দেওয়া ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতকে সিন্ডিকেটের জিম্মি করার একটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখা হয়।
এর বাস্তব প্রমাণ পাই ভারতের আদানি গ্রুপের সাথে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের স্বাক্ষর করা ২০১৭ সালের ২৫ বছর মেয়াদি বিদ্যুৎ চুক্তিটিকে দেশি-বিদেশি অর্থনীতিবিদ, আইনজ্ঞ ও জাতীয় পর্যালোচক কমিটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের স্বার্থপরিপন্থী এবং একতরফা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় নির্মিত ১,৬০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সংক্রান্ত এই চুক্তির মূল গোপন অভিসন্ধি এবং উভয় পক্ষের রাজনৈতিক ও আর্থিক স্বার্থের সংযোগগুলার কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হচ্ছে, রাজনৈতিক বৈধতা ও ভূ-রাজনৈতিক সমর্থন অর্জনের মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন এবং পরবর্তীতে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় শেখ হাসিনার সরকারের ওপর পশ্চিমা বিশ্বের যে গণতান্ত্রিক চাপ ছিল, তা মোকাবেলায় ভারতের একচ্ছত্র রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন প্রয়োজন ছিল।
এজন্য আদানি-মোদি সংযোগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে শিল্পপতি গৌতম আদানির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত। ভারতের ক্ষমতাসীন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সন্তুষ্ট রাখার উদ্দেশ্যে আদানিকে এই বিশাল চুক্তি উপহার দেওয়া হয়, যেন তা শেখ হাসিনার ক্ষমতার স্থায়িত্ব ও রাজনৈতিক সুরক্ষায় প্রভাব ফেলে।
আর এই অভূতপূর্ব ক্যাপাসিটি চার্জ ও আর্থিক লাভ বিদ্যুৎ না নিলেও অর্থ প্রদানে চুক্তির শর্তানুযায়ী, বিদ্যুৎ কেনা হোক বা না হোক, বাংলাদেশকে আগামী ২৫ বছরে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের বেশি কেবল 'ক্যাপাসিটি চার্জ' বা কেন্দ্র ভাড়া হিসেবে আদানিকে দিতে হবে। মূলত এই বেনচমার্ক জালিয়াতি জাতীয় সমীক্ষা কমিটির তদন্তে দেখা গেছে, আদানির সাথে মূল্যের ভিত্তি বা বেঞ্চমার্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভারতের অভ্যন্তরীণ গ্রিড মূল্য বা অন্যান্য সস্তা উৎস বিবেচনা না করে, স্থানীয় বিতর্কিত ‘এস আলম’ গ্রুপের একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল চুক্তিকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
এতে কয়লার অতিরিক্ত দাম ও করছাড়ের সুবিধা আত্মসাৎ করার লক্ষ্যে কয়লার দামের ক্যাপ না রাখায় ভারতের পায়রা বা অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তিতে কয়লার আন্তর্জাতিক মূল্যে নির্দিষ্ট 'ক্যাপ' (সর্বোচ্চ সীমা) থাকলেও, আদানির চুক্তিতে তা রাখা হয়নি। ফলে, বাজারের চেয়ে অনেক বেশি দামে কয়লার বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। শুধু তাই নয়, ভারতের প্রদত্ত ট্যাক্স ছাড়ের সুফল গোপনে ভারত সরকার গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করায় আদানি বিপুল করছাড়ের সুবিধা পেয়েছিল। কিন্তু সেই আর্থিক ছাড়ের কোনো সুফল চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে দেওয়া হয়নি।
বরং পুরোটাই আদানির পকেটে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা এড়িয়ে সরাসরি চুক্তি দ্রুত সরবরাহ আইনের সুযোগে উন্মুক্ত দরপত্র বা প্রতিযোগিতা ছাড়া ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’-এর অধীনে কোনো আন্তর্জাতিক অডিট ছাড়াই চুক্তিটি সই করা হয়। আরো বিস্ময়কর বিষয় হলো ২০২৬ সালের পর্যালোচক কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চুক্তি সংক্রান্ত নির্দেশনাগুলো সরাসরি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেই নিয়ন্ত্রিত হতো এবং এতে নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কয়েকজন ব্যক্তি অবৈধ আর্থিক সুবিধার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।
তাই বলতে হচ্ছে, এই চুক্তিতে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সন্তুষ্ট করে নিজ সরকারের ক্ষমতা রক্ষা করার অভিসন্ধি ছিল মুখ্য। অপরদিকে আদানি গ্রুপকে একটি ঝুঁকিমুক্ত বাজার দেওয়া হয়, যেখানে ভারতের পরিবেশ ও কর-সংক্রান্ত সব ঝুঁকি বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছে। আর বর্তমানের জেনজিরা মূলত এসব গোমরগুলো বুঝতে পেরেই ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ১৪০০ মতান্তর ২০০০ জনের জীবনের বিনিময়ে ও ৩০ হাজার গুরুতর আহতের মহাত্যাগে জুলাই বিপ্লব সংঘটিত করে। এবং বর্তমানে এ বিশাল শক্তিশালী মাফিয়া চক্রের বিরুদ্ধে তারা প্রাণপণ লড়াই করে যাচ্ছে।
লেখক: গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









