ব্যাংকে মানুষের টাকা জমা থাকে নিরাপত্তার আশায়, অনিশ্চয়তার ঝুঁকি নিতে নয়। অথচ দেশের ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক চিত্র সেই আস্থার জায়গাটিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিপুল খেলাপি ঋণ, বাড়তে থাকা প্রভিশন ঘাটতি এবং একের পর এক নীতিগত ছাড়ের ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকের ৭৮ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রভিশন ঘাটতি এবং সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ২ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি এই সংকটের গভীরতার স্পষ্ট প্রমাণ। এর সঙ্গে রয়েছে ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ- মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিপুল ঝুঁকি নিয়ে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা আর কতদিন টিকে থাকবে? সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো, এই সংকট এক দিনে তৈরি হয়নি।
বছরের পর বছর ঋণ বিতরণে অনিয়ম, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের বিশেষ সুবিধা, দুর্বল তদারকি এবং ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে সমস্যাটি আজকের ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু সংকট সমাধানের বদলে বিভিন্ন সময়ে নেওয়া হয়েছে এমন কিছু নীতি, যা মূল সমস্যাকে আড়াল করেছে মাত্র। পুনঃতফসিল, সুদে ছাড়, ঋণ পরিশোধে নানা সুযোগ এবং অবলোপন নীতির শিথিলতা সাময়িকভাবে পরিসংখ্যানকে স্বস্তিদায়ক দেখাতে পারে, কিন্তু অনাদায়ী ঋণকে আদায়যোগ্য করে না। প্রভিশন ঘাটতির বিষয়টিও তাই গভীরভাবে দেখা দরকার। প্রভিশন কোনো নিছক হিসাবের খাত নয়; এটি ব্যাংকের সম্ভাব্য লোকসানের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা। একটি ব্যাংক যখন ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে পারে না, তখন তার প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হলে সেই ঝুঁকির শেষ ভার বহন করতে হয় আমানতকারী ও শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে। অর্থাৎ একটি ব্যাংকের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও ঋণখেলাপির দায় শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থের ওপর এসে পড়তে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরো স্পর্শকাতর।
কারণ, এসব ব্যাংকের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা তুলনামূলক বেশি এবং সংকটে পড়লে সরকারের কাছ থেকে মূলধন সহায়তা পাওয়ার প্রত্যাশাও থাকে। কিন্তু জনগণের করের টাকা দিয়ে বারবার দুর্বল ব্যাংককে টিকিয়ে রাখা কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না। এতে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত না হয়ে বরং অনিয়মের সংস্কৃতি আরো শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ শুধু দুর্বল ব্যাংককে বাঁচিয়ে রাখা নয়; বরং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। ভালো কাজের জন্য নীতি সহায়তা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু ঋণখেলাপি ও অনিয়মকে পুরস্কৃত করে এমন নীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। নিয়মের ব্যতিক্রম যদি নিয়মে পরিণত হয়, তাহলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ভেঙে পড়তে বাধ্য।
এখন প্রয়োজন পরিসংখ্যান সাজানোর চেষ্টা নয়, সমস্যার মূলে আঘাত করা। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এবং ব্যবসায়িক কারণে সাময়িকভাবে সমস্যায় পড়া ঋণগ্রহীতাকে আলাদা করতে হবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। বড় ঋণের ক্ষেত্রে প্রকৃত মালিকানা, অর্থের ব্যবহার ও পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা যাচাই আরো কঠোর করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা ও ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতদের দায় নির্ধারণ করতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো, বারবার সুযোগ দিয়ে খেলাপি সংস্কৃতিকে বৈধতা দেওয়া বন্ধ করা। ঋণ নেওয়া সহজ, কিন্তু ফেরত না দিলেও সমস্যা নেই- এমন ধারণা ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য আত্মঘাতী। ঋণ আদায় বাড়ানো এবং নতুন করে অনাদায়ী ঋণ সৃষ্টি বন্ধ করাই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। পাশাপাশি প্রভিশন ঘাটতি পূরণের জন্য বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য স্বচ্ছ পুনর্গঠন পরিকল্পনা নিতে হবে।
ব্যাংক খাত একটি অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে তার অভিঘাত শুধু ব্যাংকের আয়-ব্যয়ের হিসাবে সীমাবদ্ধ থাকে না; বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের সঞ্চয়- সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই এখন আর সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই। ব্যাংক খাতকে বাঁচাতে হলে ঋণখেলাপিদের নয়, আমানতকারীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নিয়ম ভাঙার সংস্কৃতি বন্ধ করে জবাবদিহি ও কঠোর তদারকির ভিত্তিতে ব্যাংকিং ব্যবস্থা পুনর্গঠন করতেই হবে। অন্যথায় আজকের প্রভিশন ঘাটতি আগামী দিনের আরো বড় আর্থিক সংকটের পূর্বাভাস হয়ে দাঁড়াতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









