মানুষ চলে যায় ঐশ্বরিক নিয়মে, কিন্তু তাদের জীবন ও কর্মের সৃষ্টিশীল চিহ্নই পৃথিবীর বুকে অম্লান হয়ে থাকে। যুগে যুগে এসব কীর্তি, মানব হৃদয়ের গভীর আসনে জায়গা করে নেয়। তেমনি একজন মহানায়ক- বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত অভিনেতা আনোয়ার হোসেন। যিনি বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন নবাব খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
তিনি ১৯৩১ সালের ৬ নভেম্বর জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলাস্থ দুরমুঠ ইউনিয়নের এক প্রত্যন্ত গ্রাম সরুলিয়ার মিয়াবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা এ কে এম নাজির হোসেন ছিলেন সাব-রেজিস্ট্রার ও মাতা সাঈমা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। তিনি পিতা-মাতার তৃতীয় সন্তান। ডাক নাম আনু। বাবার চাকরির সুবাদে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় ১৯৪০ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির মধ্য দিয়ে তার শিক্ষাজীবন আরম্ভ হয়। মাধ্যমিকে ভর্তি হন জামালপুর জেলা স্কুলে।
সেখান থেকে ১৯৫১ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি হন। কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্রাবস্থায় আসকার ইবনে শাইখের ‘পদক্ষেপ’ নাটকে অভিনয় করার পর থেকে নাটকের প্রতি তার আগ্রহ বাড়ে। প্রথম বর্ষের পরীক্ষা দিয়ে বাবার বন্ধু আবদুল্লাহ খানের সেলকন ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে সুপারভাইজারের চাকরির মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৫৭ সালে ঢাকায় আসেন এবং নাসিমা খানমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দাম্পত্যজীবনে চার পুত্র ও এক কন্যা সন্তান জন্ম নেয়।
১৯৫৯ সালে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ননী দাসের পরিচালনায় ‘এক টুকরো জমি’ নাটকে অভিনয় করেন। ঢাকা বেতারে অডিশন দিয়ে প্রথমবারেই মনোনীত হন। ‘হাতেম তাই’ নাটকে একটি ছোট চরিত্রে অভিনয়ে ভয়েস দেন। তারপর নেশায় পরিণত হয় অভিনয় জগৎ। তখনকার রূপালী জগতের জনপ্রিয় তারকা ছবি বিশ্বাস, কাননদেবী এদের সিনেমা দেখতে দেখতেই এ জগতে আসার প্রবল ইচ্ছে বাসা বাঁধে তার মনে। নিজেকে সমৃদ্ধ ও বলিষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালান হাল্কা-পাতলা দীর্ঘ অবয়বের সুদর্শন এই মানুষ। আর তাই ঝিনুক পত্রিকার সম্পাদক আসিরুদ্দিনের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত করেন মিনার্ভা থিয়েটার।
মিনার্ভা থিয়েটারের সঙ্গে আরো যুক্ত হন সৈয়দ হাসান ইমাম, ফতেহ লোহানী, মেহফুজ, সুভাষ দত্ত, চিত্রা সিনহাসহ অনেকে। পদার্পণ করেন মঞ্চ নাটকে। সেখানে অভিনয় করতে গিয়ে পরিচয় হয় আব্দুল জব্বার খান, মোহাম্মদ আনিস ও হাবিবুর রহমানের সঙ্গে। ১৯৬১ সালে মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘তোমার আমার’ ছবিতে ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ হয়ে উঠে তার। এরপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি। সালাহউদ্দিন পরিচালিত ‘সূর্যস্নান’ ছবিতে নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ১৮টি ছবিতে কাজ করেন তিনি। ১৯৬৭ সালে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ছবিতে নবাবের চরিত্রে অভিনয় করে পান ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি। সিরাজের দেশপ্রেমের যন্ত্রণা দর্শকদের মনে জাগিয়ে দিতে পেরেছেন বলে ছবিটি প্রশংসিত হয়। বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলা চরিত্রটি তার চেহারা ও বাচনভঙ্গিতে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল।
তখনই দর্শকমহলে খ্যাতি অর্জন করেন মুকুটহীন নবাব বা সম্রাট। তিনি অভিনয় জগতের প্রতিটি চরিত্রই ফুটিয়ে তু্লেছিলেন। ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সাহিত্যনির্ভর, শিশুতোষ, লোককাহিনিভিত্তিক, পোশাকি ফ্যান্টাসি, পরিচ্ছন্ন সামাজিক, পারিবারিক মেলোড্রামা, বক্তব্যধর্মী- সব ধরনের ছবিতে অভিনয় করেছেন। তার মধ্যে দর্শকপ্রিয় অন্যতম সিনেমাগুলো হলো- ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘সূর্যস্নান’, ‘লাঠিয়াল’, ‘জয় বাংলা’, ‘ভাত দে’, ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘লাঠিয়াল’, ‘পালঙ্ক’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘সখিনার যুদ্ধ’, ‘নাজমা’, ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘সূর্যসংগ্রাম’ সহ প্রায় পাঁচ শতাধিক বাংলা সিনেমা। একজন শক্তিশালী ও বলিষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে আনোয়ার হোসেন থেকে যাবেন যুগের পর যুগ দর্শকদের হৃদয় গহীনে। এক কথায় তার অভিনয় শৈলী ছিল অনবদ্য। দীর্ঘদিন অভিনয়ের জন্য অর্জন করেছেন অনেক পদক ও পুরস্কার।
তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৬৭ সালে পেয়েছেন পাকিস্তানের ‘নিগার পুরস্কার’। ১৯৭৫ সালে ‘লাঠিয়াল’ সিনেমার জন্য বাংলাদেশের একমাত্র চলচ্চিত্র পুরস্কার ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ লাভ করেন। ১৯৭৮ সালে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ও ‘দায়ী কে’ সিনেমার জন্য ‘শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা’ পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি ‘একুশে পদক’ ও ‘দুবার বাচসাস’ পুরস্কার লাভ করেন। ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পাশাপাশি আনোয়ার হোসেনকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করেন।
এছাড়াও তিনি ‘মেরিল-প্রথম পুরস্কার’ ও ২০১১ সালে ‘ওয়ালটন-বৈশাখী স্টার অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। তিনি দীর্ঘ পাঁচ দশক দিনরাত কাজ করেছেন বাংলা সিনেমায়। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে কাজ না করায় একাকিত্বে ভুগেছেন। ২০১৩ সালের ১৮ আগস্ট শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে।
অবশেষে হাজারো দর্শক ও সহকর্মীদের অশ্রুসিদ্ধ করে ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮২ বছর বয়সে ঢাকার চলচ্চিত্রের ‘নবাব’ খ্যাত এই অভিনেতা পরলোকগমন করেন। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার অভিনয়, সৃষ্টিশীলতা এবং তার রেখে যাওয়া শিল্পকর্ম আজও রঙিন পর্দায় জীবন্ত এবং চিরকাল বেঁচে থাকবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









