সরকারি আবাসন প্রকল্প সাধারণ মানুষের আবাসন-স্বপ্ন পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। অথচ সেই প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, ক্রয়প্রক্রিয়া ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়ে যদি অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তবে তা শুধু একটি প্রকল্পের প্রশ্ন নয়—এটি রাষ্ট্রীয় অর্থের সুরক্ষা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মোহাম্মদপুরের ‘দোলনচাঁপা-কনকচাঁপা’ প্রকল্প ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো তাই গভীরভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।
প্রকল্পটির মূল ব্যয় ছিল ৪৬৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধনীতে তা বেড়ে হয়েছে ৫৪১ কোটি ২১ লাখ টাকা—অর্থাৎ প্রায় ৭২ কোটি টাকা বৃদ্ধি। প্রশ্নের সবচেয়ে বড় জায়গা বৈদ্যুতিক ও ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল খাত। বিশেষ করে ১৯টি লিফট কেনার ব্যয় ১৭ কোটি ২০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৪৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ লিফটের সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকলেও ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। সাবস্টেশন, জেনারেটর, পাম্প-মোটর, অগ্নিনিরোধক ব্যবস্থা ও ফোর্স ভেন্টিলেশনেও ব্যয় বৃদ্ধির তথ্য সামনে এসেছে।
এখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। প্রকৌশলী মো. মিরাজ হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘বি’ ক্যাটাগরির পরিবর্তে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে ‘এ’ ক্যাটাগরির লিফটের ব্যয় ধরা হয়েছে এবং পিডব্লিউডির সংশোধিত শিডিউল অনুসরণ করা হয়েছে। তিনি এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই বলেও দাবি করেছেন। কিন্তু এই ব্যাখ্যাই বরং আরও একটি প্রশ্ন সামনে আনে—ক্যাটাগরি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা, মূল্য নির্ধারণ এবং সংশোধিত দরপত্রের যৌক্তিকতা কি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছিল?
একই ব্যক্তি দীর্ঘ সময় একই গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলে তাঁর অভিজ্ঞতা যেমন কাজে লাগতে পারে, তেমনি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। তাই ২০০৬ সাল থেকে একই বিভাগে থাকার অভিযোগ সত্য হলে, বিষয়টি প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কোনো কর্মকর্তা দোষী—এমন সিদ্ধান্ত তদন্তের আগে দেওয়া যাবে না; তবে দীর্ঘদিন একই পদে থাকা, বড় অঙ্কের ক্রয় এবং ঠিকাদারদের সঙ্গে সম্ভাব্য স্বার্থের সম্পর্ক—সবকিছু মিলিয়ে স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
আরও গুরুতর হলো, প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়ে ওঠা অভিযোগ। যাঁদের অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা, তাঁরা বঞ্চিত হয়ে থাকলে এবং রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রশাসনিক প্রভাবের ভিত্তিতে কেউ সুবিধা পেয়ে থাকলে তা হবে ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। একইভাবে নির্ধারিত কোটার বাইরে বরাদ্দের অভিযোগও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি রাখে।
এখন প্রয়োজন অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ নয়, প্রমাণভিত্তিক তদন্ত। লিফটসহ প্রতিটি ক্রয়ের মূল প্রাক্কলন, সংশোধিত প্রাক্কলন, দরপত্র, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ, সরবরাহের মান এবং বাজারদর প্রকাশ করা উচিত। ফ্ল্যাট বরাদ্দের ক্ষেত্রেও উপকারভোগীদের যোগ্যতা ও পূর্ববর্তী সরকারি প্লট-ফ্ল্যাট মালিকানার তথ্য যাচাই করতে হবে।
দোলনচাঁপা-কনকচাঁপা যেন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুবিধা আদায়ের প্রকল্পে পরিণত না হয়। রাষ্ট্রীয় অর্থ জনগণের অর্থ। সেই অর্থের প্রতিটি টাকার হিসাব এবং প্রতিটি ফ্ল্যাটের বরাদ্দ হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায্য ও নিরীক্ষাযোগ্য। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্টদেরও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দায়মুক্ত করতে হবে। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো—নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকাশ্য তথ্য এবং জবাবদিহি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









