বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রের সামনে একই সঙ্গে দুটি বিপরীতমুখী প্রয়োজন স্পষ্ট- একদিকে উদারতা, সহনশীলতা, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও গণতান্ত্রিক পরিসর সম্প্রসারণ; অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধের বিরুদ্ধে দৃঢ়তা, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং জনজীবনে নিরাপত্তা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।
অস্থির ও বিভক্ত রাজনৈতিক পরিবেশে সরকারের উদারনীতি নিছক সৌজন্য নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশলগত প্রয়োজন। কিন্তু উদারতা যদি দুর্বলতা হিসেবে প্রতিভাত হয়, আইন অমান্যকারীরা যদি তার সুযোগ নেয় কিংবা সহনশীলতার নামে সহিংসতা ও নৈরাজ্যকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তাহলে উদারনীতির উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। তাই সময়ের দাবি- রাজনীতিতে উদারতা, রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়নিষ্ঠা এবং আইন প্রয়োগে দৃঢ়তা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতায় নয়, জনগণের আস্থায়। সেই আস্থা তৈরি হয় তখনই, যখন মানুষ দেখে রাষ্ট্র রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ কিংবা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সবার অধিকার সমানভাবে বিবেচনা করছে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করছে। আইন তার স্বাভাবিক গতিতে চলছে; অপরাধ দমন ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলদের সুরক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী মতকে প্রতিপক্ষের বদলে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে। ক্ষমতার পালাবদলও অনেক সময় নীতির পরিবর্তনের বদলে প্রতিশোধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সংঘাতে রূপ নিয়েছে, প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা। বেড়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর অপতৎপরতা ও নতজানু প্রবণতা। জনজীবনে বেড়েছে সংশয়, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। এই বাস্তবতায় বর্তমান সরকারের উদারনীতির ইতিবাচক দিক হলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে বিবেচনার বার্তা।
দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, যারা সরকারকে ভোট দিয়েছেন, যারা দেননি কিংবা কাউকেই ভোট দেননি- সবার অধিকার সমান। সংসদেও সাংবিধানিক সংস্কারের মতো জাতীয় প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলের একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বাজেট প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণকেও নতুন রাজনৈতিক চর্চার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মূল্য অবশ্য নির্ধারিত হবে বাস্তব প্রয়োগে। তবুও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গ্রহণের প্রবণতা ও মানসিকতা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক এবং গণতন্ত্রের বিকাশে সহায়ক। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য একমত হওয়ার মধ্যে নয়; ভিন্নমতকে সহ্য করার সক্ষমতার মধ্যেই।
একটি দেশ শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় উন্নত হয় না। উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং বিনিয়োগের নিরাপদ পরিবেশ। একই সঙ্গে প্রয়োজন গঠনমূলক, পরিকল্পিত ও কার্যকর রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সাংবিধানিক অধিকার। কারণ, টেকসই ও সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য কেবল অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বা জিডিপি বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়; বরং সুশাসনভিত্তিক শক্তিশালী রাষ্ট্রকাঠামো অপরিহার্য। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীর আস্থা কমায়, ব্যবসার ব্যয় বাড়ায়, কর্মসংস্থান সংকুচিত করে। সংঘাতময় রাজনীতি জনজীবন ও উৎপাদনশীলতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে সরকারের উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি যদি সংঘাত কমিয়ে রাজনৈতিক আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে, তার সুফল অর্থনীতি ও সমাজেও পড়বে। তবে উদারতা মানে দুর্বলতা নয়। রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং আইন ভঙ্গের অনুমতি এক বিষয় নয়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সহিংসতার স্বাধীনতাও এক নয়। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে মানুষের অধিকার ও জানমাল ধ্বংস এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার অধিকার রাষ্ট্রের আইনে স্বীকৃত নয়। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির অধিকার যেমন সুরক্ষিত করতে হবে, তেমনি অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, লুটপাট, হত্যা কিংবা অন্যের নিরাপত্তা ধ্বংসের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াও সরকারের দায়িত্ব। গণতন্ত্র রাষ্ট্রকে নাগরিকের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব দেয়; রাষ্ট্রের আইন অকার্যকর করার নয়। কেউ সরকারের সমালোচনা করলে তার অধিকার সুরক্ষিত হবে। কেউ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। কিন্তু অপরাধ করলে রাজনৈতিক পরিচয় কোনো ঢাল হতে পারে না। এই সীমারেখা স্পষ্ট থাকলেই সরকারের উদারনীতি বিশ্বাসযোগ্য হবে। এই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় হুমকি মব কালচার।
কোনো ব্যক্তি অপরাধ করেছে কিনা, তার বিচার আদালতে হবে- এটাই সভ্য রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি। গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্তেজনা, রাজনৈতিক বিদ্বেষ বা ব্যক্তিগত আক্রোশের ভিত্তিতে জনতা যখন কাউকে শাস্তি দিতে শুরু করে, তখন শুধু একজন ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থাই আক্রান্ত হয়। এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
আজ জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি একজনের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে; কাল সেটি সাংবাদিক, শিক্ষক, রাজনৈতিক কর্মী কিংবা সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধেও যেতে পারে। তাই মবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে দৃঢ় হতে হবে। অভিযোগ যাই হোক, বিচার হবে আইনের মাধ্যমে; শাস্তি দেবে আদালত, জনতা নয়- এই নীতিতে কঠোর থাকতে হবে। তবে মব কালচার শুধু কঠোর হাতে দমন করলেই বন্ধ হবে না। মানুষ কেন আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, তারও উত্তর খুঁজতে হবে। বিচারব্যবস্থা ও আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার সংকট তার অন্যতম কারণ। মানুষ যদি বিশ্বাস করে অপরাধীর বিচার হবে না, প্রভাবশালী ব্যক্তি আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধ আড়াল করবে, তাহলে আইনের প্রতি সামাজিক আস্থা ভেঙে পড়বে। তাই মব ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো এমন বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে মানুষ বিশ্বাস করবে- রাষ্ট্র ন্যায়বিচার দিতে পারে। সমাজে আইনের শাসন যত শক্তিশালী হবে, মানুষের হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা তত দুর্বল হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের গভীরে রয়েছে রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকটও। পরাজিত পক্ষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, বিজয়ী পক্ষ ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী কর্তৃত্ব মনে করে। অথচ গণতন্ত্রে আজকের ক্ষমতাসীন দলই আগামী দিনের বিরোধী দল হতে পারে। তাই ক্ষমতার পরিবর্তন যেন প্রতিশোধের পরিবর্তন না হয়- এটাই হওয়া উচিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির মৌলিক নীতি। সরকার এই জায়গায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার রক্ষা, শান্তিপূর্ণ কর্মকাণ্ডের সুযোগ, সমালোচনার জবাব যুক্তি দিয়ে দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করাই হতে পারে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির শুরু। বর্তমান সরকারের সামনে তাই উদারতা ও দৃঢ়তার সঠিক সমন্বয় করার সুযোগ রয়েছে। শুধু কঠোরতা দিয়ে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা আসে না; আবার শুধু উদারতা দিয়ে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলাও টেকে না। ভিন্নমতের জন্য রাষ্ট্র উন্মুক্ত হবে, কিন্তু সহিংসতার জন্য নয়; সমালোচনায় সহনশীল হবে, কিন্তু অপরাধে নয়; রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাঠ উন্মুক্ত থাকবে, কিন্তু আইন ভাঙার জন্য নয়। এই ভারসাম্যই একটি পরিণত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
বাংলাদেশের মানুষ শুধু উন্নয়ন নয়, প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নও চায়। তারা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সঙ্গে নিরাপত্তা ও মর্যাদা চায়; রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে এমন রাষ্ট্র চায়, যেখানে সন্তান নিরাপদে রাস্তায় চলতে পারে, ব্যবসায়ী নিশ্চিন্তে ব্যবসা করতে পারেন, সাংবাদিক প্রশ্ন করতে পারেন এবং কোনো নাগরিক গুজবের কারণে জনতার হাতে নিগৃহীত না হন। একই সঙ্গে তারা চান, কেউ যেন গুম, খুন, মামলা-হামলার শিকার না হন। এই প্রত্যাশার উত্তর হলো- আইনের শাসনভিত্তিক উদার রাষ্ট্র। বর্তমান সরকারের সামনে তাই ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে- অতীতের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ধারা ভেঙে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপন করা।
পক্ষপাতহীন জনপ্রশাসন, স্বাধীন ও সক্ষম রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান এবং ‘আইন সবার জন্য সমান’- এই নীতিগুলোকে বক্তব্যে নয়, রাষ্ট্রচর্চায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শেষ পর্যন্ত সরকারের উদারতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে- তার সমালোচক কতটা নিরাপদ, বিরোধীরা কতটা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে এবং আইন ভাঙলে নিজের পক্ষের মানুষও কতটা আইনের মুখোমুখি হয়। একইভাবে তার দৃঢ়তার পরীক্ষা হবে- ক্ষমতা কতটা সংযম, ন্যায় ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে প্রয়োগ করা হয়। সুতরাং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির নীতি হওয়া উচিত সহজ কিন্তু কঠিন- মতভেদে উদারতা, অপরাধ দমনে দৃঢ়তা, রাষ্ট্র পরিচালনায় নিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্রে অটলতা। উদারতা যদি হয় অধিকারের প্রতি, আর দৃঢ়তা যদি হয় আইনের প্রতি, তবেই তা দুর্বলতার নয়- রাষ্ট্রনায়কত্বের পরিচয়। এই সমন্বিত নীতিতেই ফুটে উঠুক উন্নত, আধুনিক, উদার ও অধিকতর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ।
লেখক : অধ্যাপক, কবি ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









