বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এমন এক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে পুরনো বন্ধন, বর্তমানের রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার প্রয়োজন- তিনটিই পাশাপাশি উপস্থিত।
প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য নতুন কিছু নয়; কিন্তু যখন সেই মতপার্থক্য পারস্পরিক আস্থার সংকটে রূপ নেয়, তখন তার প্রভাব শুধু কূটনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা এবং দুই দেশের মানুষের স্বাভাবিক যোগাযোগ- সব ক্ষেত্রেই তার প্রতিফলন দেখা যায়। তাই বর্তমান অস্বস্তিকে দীর্ঘস্থায়ী দূরত্বে পরিণত না করে সম্পর্কের ভিত্তিতে যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা কীভাবে দূর করা যায়- এ প্রশ্নটিই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের গুরুত্ব শুধু ভৌগোলিক নৈকট্যে নয়; দুই দেশের ইতিহাস, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের সঙ্গেও তা গভীরভাবে যুক্ত। এক দেশের অভ্যন্তরীণ বা পররাষ্ট্রনীতির কোনো সিদ্ধান্ত অন্য দেশের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ দুই দেশের সম্পর্কে নতুন কিছু প্রশ্ন ও অস্বস্তি তৈরি করেছে। তবে মতপার্থক্য কিংবা রাজনৈতিক টানাপোড়েন কোনো সম্পর্কের স্থায়ী নিয়তি হতে পারে না। বরং এমন পরিস্থিতিতেই দায়িত্বশীল কূটনীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং খোলামেলা সংলাপের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।
বাংলাদেশ ও ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান এমন, এক দেশের সিদ্ধান্তের প্রভাব অন্য দেশের ওপর পড়বেই। দুই দেশের কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পারস্পরিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত। সীমান্তবাণিজ্য থেকে শুরু করে পানি, যোগাযোগ, জ্বালানি ও নিরাপত্তা- বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। ফলে, রাজনৈতিক অস্বস্তিকে কেন্দ্র করে সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গতি থমকে থাকা কোনো পক্ষের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনবে না।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্ক একটি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। এই পরিবর্তনকে ঘিরে উভয় দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই পারে। কিন্তু সেই পার্থক্য যেন পারস্পরিক অবিশ্বাসকে আরো গভীর না করে, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভারতে অবস্থান এবং তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যকে কেন্দ্র করে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে আবেগের পরিবর্তে কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা ও বাস্তবতার আলোকে আলোচনা প্রয়োজন।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের পরিধি এত বিস্তৃত যে একটি বা দুটি রাজনৈতিক ইস্যুর কারণে এর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র অচল হয়ে থাকা কাম্য নয়। বাণিজ্য, যোগাযোগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি, পানি, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও মানুষের যাতায়াত- প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিয়মিত সংলাপ প্রয়োজন। বিশেষ করে, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন এবং সীমান্তসংক্রান্ত বিষয়গুলো মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এসব প্রশ্নে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু মতপার্থক্যের সমাধান আলোচনার টেবিলেই খুঁজতে হবে। যোগাযোগ বন্ধ রেখে কোনো জটিল সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
দুই দেশের সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। সীমান্তে শান্তি, বৈধ বাণিজ্যের সুযোগ, মানুষের নিরাপদ চলাচল এবং সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সহযোগিতা- এসব বিষয়ে নিয়মিত ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একইভাবে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আস্থার পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি। দুই দেশের ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, পর্যটক ও সাধারণ মানুষের যোগাযোগ যত স্বাভাবিক থাকবে, পারস্পরিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্রও তত বিস্তৃত হবে।
এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে। উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য বা পারস্পরিক সন্দেহকে আরো উসকে দেওয়ার পরিবর্তে তথ্যনির্ভর ও দায়িত্বশীল আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে সংবেদনশীল থাকা যেমন জরুরি, তেমনি নিজ দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও সুস্পষ্ট অবস্থান বজায় রাখা প্রয়োজন।
বন্ধুত্ব মানে সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়; বরং মতভেদ থাকা সত্ত্বেও আলোচনার পথ খোলা রাখা। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সম্পর্ক হিসেবে দেখলে এর ব্যাপ্তি ও গুরুত্ব খাটো করা হয়। রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের স্থায়িত্ব নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক যোগাযোগ, পারস্পরিক স্বার্থের ভারসাম্য এবং জনগণের মধ্যে আস্থার ওপর। তাই সাময়িক রাজনৈতিক অস্বস্তিকে দীর্ঘমেয়াদি বিচ্ছিন্নতায় রূপ না দিয়ে দুই দেশের উচিত বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো সক্রিয় রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করা।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সামনে চ্যালেঞ্জ আছে, কিন্তু সহযোগিতার ক্ষেত্রও কম নয়। প্রয়োজন বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ধৈর্যশীল কূটনীতি। অতীতের বিরোধকে অস্বীকার না করে সেগুলোর শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের সম্পর্ককে আরো স্থিতিশীল করার উদ্যোগই হতে পারে উভয় দেশের জন্য কার্যকর পথ। দুই দেশের জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়মিত সংলাপ, পারস্পরিক আস্থার পুনর্গঠন এবং অমীমাংসিত বিষয়গুলোর শান্তিপূর্ণ সমাধানে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালানো জরুরি।
প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরকে এড়িয়ে নয়, বরং পারস্পরিক স্বার্থ ও মর্যাদাকে সম্মান করে এগিয়ে গেলেই একটি স্থিতিশীল ও সম্ভাবনাময় আঞ্চলিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব। ফলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য কিংবা সাময়িক কূটনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে সহযোগিতার বিকল্প নেই। সর্বোপরি, পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনে কার্যকর ও দায়িত্বশীল কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









