রাজনীতিতে আশাবাদ ভালো, স্বপ্ন দেখা আরো ভালো। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে যে একটা নদী থাকে, সেই নদী সাঁতরে পার হতে হলে শুধু আবেগ দিয়ে হয় না, সাঁতারও জানতে হয়। আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-কর্মী এখনো এমন এক রাজনৈতিক স্বপ্নে বিভোর যে, ডিসেম্বর এলেই শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন, সঙ্গে ফিরবে আওয়ামী লীগ, আর বাংলাদেশের রাজনীতির ঘড়ি যেন আবার ৫ আগস্ট ২০২৪-এর আগের সময়ের দিকে ঘুরে যাবে।
শেখ হাসিনা নিজেও ২০২৬ সালের জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। আগস্টেও তিনি সেই ইচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ফলে, ডিসেম্বর ফেরার কথা যে একেবারে বানানো গল্প, তা নয়। কিন্তু রাজনীতির অঙ্কটা এখানেই শেষ নয়। বরং এখান থেকেই আসল অঙ্ক শুরু। আর সেই অঙ্কের খাতায় ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর দিনটি নতুন করে মোটা অক্ষরে লেখা হয়ে গেল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২।
দণ্ডপ্রাপ্ত অন্যরা হলেন- বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান, সাদ্দাম হোসেন ও শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। এই রায়কে কেবল একটি মামলার বিচারিক পরিণতি হিসেবে দেখলে বিষয়টির রাজনৈতিক গভীরতা বোঝা যাবে না। ওবায়দুল কাদের দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান মুখ, সরকারের নীতির প্রকাশ্য ব্যাখ্যাদাতা এবং দলীয় সাংগঠনিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর সঙ্গে একই মামলায় দলের আরো কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার মৃত্যুদণ্ডের রায় আসা মানে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ এখন সরাসরি গুরুতর আইনি দায়ের মুখোমুখি।
এটি দলের জন্য শুধু নেতৃত্বের সংকট নয়; এটি রাজনৈতিক বৈধতা, সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ এবং জনসমক্ষে আত্মপক্ষসমর্থনের সক্ষমতা- সবকিছুর ওপর গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে। আমাদের মানতে হবে, এমন রায় রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আমূল বদলে দেয়। যে নেতারা একসময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সিদ্ধান্ত দিতেন, তাঁদেরই এখন আদালতের রায়, আইনি প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহির কাঠামোর সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে। ওবায়দুল কাদেরদের মৃত্যুদণ্ডের আলোচনা তাই ব্যক্তিগত শাস্তির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়।
এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের সীমা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় এবং দলীয় আনুগত্যের নামে অপরাধের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি নিয়ে বৃহত্তর বিতর্ক। তবে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, আওয়ামী লীগের যে নেতৃত্ব একসময় নিজেদের রাষ্ট্রের সমার্থক ভাবতে অভ্যস্ত ছিল, তাঁদের একটি অংশ এখন রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার সামনে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত। ক্ষমতার সময় তাঁরা হয়তো মনে করেছিলেন, দলীয় পরিচয়, প্রশাসনিক প্রভাব কিংবা দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস তাঁদের রক্ষা করবে। কিন্তু আদালতের রায় দেখিয়ে দিল- ক্ষমতার ছায়া সরে গেলে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দায়ের প্রশ্ন সামনে আসতেই পারে। এখানে প্রশ্ন উঠবে, ওবায়দুল কাদেরদের মৃত্যুদণ্ডের রায় কি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাকে আরো সংকুচিত করল কি? উত্তর সহজ নয়, কিন্তু বাস্তবতা কঠিন। দলের সাধারণ সম্পাদকসহ একাধিক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে এমন রায় এলে দলকে শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, নিজেদের অতীত ভূমিকা নিয়েও ব্যাখ্যা দিতে হয়। এর আগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে- এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে ডিসেম্বরে ‘ফেরার’ সময় কতটা সহজ হতে পারে তা ভাবনার বিষয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ডিসেম্বরের কোন ট্রেনটি আসছে? ট্রেনের নাম ‘ফেরা’। কিন্তু স্টেশনে পৌঁছে দেখা গেল- টিকিট আছে কিনা, প্ল্যাটফর্ম খোলা আছে কিনা, ট্রেনের ইঞ্জিনে জ্বালানি আছে কিনা, আর যাত্রী নিজে উঠতে পারবেন কিনা- এসব প্রশ্নের উত্তর কেউ দিচ্ছে না। শুধু ঘোষণা হচ্ছে, ‘ট্রেন আসবেই’। প্রবাদে আছে, ‘আকাশ কুসুম ভাবনা’। আবার গ্রামবাংলায় বলা হয়, ‘ধান ভানতে শিবের গীত’। রাজনীতির বাস্তবতা ছেড়ে কেবল প্রত্যাবর্তনের কল্পনায় বসে থাকলে সেটিও এক ধরনের রাজনৈতিক আকাশ কুসুম ভাবনা। শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে পারেন- এটি রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব বলা যায় না। কিন্তু দেশে ফেরা আর ক্ষমতায় ফেরা এক কথা নয়। আদালতে আত্মসমর্পণ করা আর জনসমুদ্রে বিজয়ীর বেশে ফিরে আসা এক কথা নয়। রাজনৈতিক দলকে পুনরায় স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনা আর বিদেশে বসে দলীয় কর্মীদের আশাবাদী রাখা এক কথা নয়।
এই পার্থক্যটিই আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী বুঝতে চাইছেন না, অথবা বুঝেও নিজেদের মনোবল ধরে রাখতে চাইছেন না। ইতিহাসে এমন উদাহরণ কম নেই। ক্ষমতা হারানোর পর অনেক শাসক ভেবেছেন, ‘সময় বদলাবে, জনগণ ভুলে যাবে’। কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম শিক্ষক। সে কারও জন্য পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির নাৎসি নেতৃত্বের কী হয়েছিল, তা ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ে আছে। ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে নাৎসি জার্মানির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হয়েছিল। ২২ জন প্রধান আসামির বিচার হয় এবং পরবর্তী আরো বিচারেও বহু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সামরিক ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল- রাষ্ট্রের ক্ষমতায় থাকা কোনো ব্যক্তিকে আইনের ঊর্ধ্বে তুলে দেয় না। ন্যুরেমবার্গের নীতিতে আরো একটি ঐতিহাসিক বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয়- ‘উপরের নির্দেশ পালন করেছি’ বললেই অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার এই ধারণা পরবর্তী আন্তর্জাতিক অপরাধবিচারের ভিত্তি শক্ত করে। বাংলাদেশেও আজ সেই প্রশ্নটিই সামনে- রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কি ব্যক্তিকে চিরস্থায়ী নিরাপত্তা দিতে পারে?
একসময় রোমান সম্রাটদের মনে হতো, সাম্রাজ্যই চিরস্থায়ী। কিন্তু রোমও ভেঙেছে। একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতারা ভাবতেন, রাষ্ট্রব্যবস্থা অটুট। অথচ ১৯৯১ সালে সেই পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যও ইতিহাসের পাতায় চলে গেল। একসময় পূর্ব ইউরোপের বহু কমিউনিস্ট শাসক মনে করেছিলেন, জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করলেই ক্ষমতা চিরস্থায়ী। বার্লিন প্রাচীর ভেঙে তাদের সেই ধারণারও কফিন তৈরি হয়েছিল। চীনের একটি প্রবাদ আছে- ‘একটি যাত্রা হাজার মাইলের হলেও শুরু হয় একটি পদক্ষেপ দিয়ে’। রাজনীতির পতনও তেমন। একটি ভুল সিদ্ধান্ত, একটি ভুল বক্তব্য, একটি অন্যায় দমননীতি, একটি অবহেলিত ক্ষোভ- সব মিলিয়ে একসময় তৈরি হয় বিস্ফোরণ।
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহও সেই ইতিহাসের একটি অধ্যায়। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ওই সময় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হতে পারেন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত হন।
এই রক্তাক্ত বাস্তবতার পর কেউ যদি ভাবেন, শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে পুরনো অবস্থানে ফিরে যাওয়া যাবে, তাহলে সেটি জনগণের স্মৃতিশক্তিকে অবমূল্যায়ন করা। আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট সম্ভবত এখানেই। দলটির একাংশ এখনো ৫ আগস্ট ২০২৪-কে একটি সাময়িক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখতে চাইছে। যেন ইতিহাসের পাতায় একটি কমা পড়েছে, দাঁড়ি নয়। যেন একটু সময় গেলে সব আগের মতো হয়ে যাবে। কিন্তু ইতিহাসে ‘আগের মতো’ বলে কোনো জায়গা নেই।
নদীর পানি একবার সরে গেলে একই পানি আর ফিরে আসে না। নদী থাকে, পাড় থাকে, নৌকাও থাকে- কিন্তু জল থাকে নতুন। রাজনীতিও তেমন। দল থাকতে পারে, কর্মী থাকতে পারে, স্মৃতি থাকতে পারে; কিন্তু জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের প্রকৃতি বদলে গেলে পুরনো সমীকরণ আর হুবহু ফিরে আসে না। এখানে একটি কথামনে পড়ে- ‘অতি লোভে তাঁতি নষ্ট’। ক্ষমতা ধরে রাখার অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা কখনো কখনো ক্ষমতাকেই দূরে ঠেলে দেয়। আবার- ‘গাছের ডালে বসে গাছের গোড়া কাটলে ফল আর পাওয়া যায় না’।
রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণ। বন্দুক দিয়ে রাস্তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, প্রশাসন দিয়ে অফিস চালানো যায়, প্রচারযন্ত্র দিয়ে কিছুদিন বয়ান তৈরি করা যায়; কিন্তু মানুষের অন্তরের ক্ষোভকে অনন্তকাল আটকে রাখা যায় না।
এ কারণেই ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কল্পনার দিকে একটু হাস্যরসের চোখেও তাকানো যায়। মনে হচ্ছে, দলের কোনো কোনো নেতার কাছে ডিসেম্বর যেন একটি ম্যাজিক মাস। ডিসেম্বর এলেই সব মামলা গায়েব, সব রায় বাতিল, সব ক্ষোভ মুছে যাবে, সব রাজনৈতিক হিসাব নতুন করে লেখা হবে! এ যেন পরীক্ষার হলে ছাত্রও বলছে- ‘স্যার, ডিসেম্বর মাসে আমার সব ভুল উত্তর নিজে নিজে ঠিক হয়ে যাবে’। বাস্তবতা অবশ্য এত দয়ালু নয়। আজকের বাংলাদেশ ২০২৪ সালের আগের বাংলাদেশ নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তির ভারসাম্য বদলেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। আদালতের রায় এসেছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। শেখ হাসিনা নিজেই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে অবস্থান করছেন।
এই পরিস্থিতিতে ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তন যদি হয়ও, সেটি হবে রাজনৈতিক রোমাঞ্চের চেয়ে বেশি আইনি বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা। ধরা যাক, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরেই দেশে ফিরলেন। বিমানবন্দরে নামলেন। এরপর কী হবে?
আদালত আছে। মামলা আছে। সাজা আছে। রাজনৈতিক দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ। জনমনে ২০২৪ সালের রক্তাক্ত স্মৃতি আছে। নিহতদের পরিবার আছে। আহতদের ক্ষত আছে। জুলাইয়ের দেয়ালে লেখা স্লোগান আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোটি কোটি পোস্ট আছে। ইতিহাসের নথি আছে। অর্থাৎ দেশে ফেরা মানেই রাজনীতিতে ফেরা নয়।
এখানে দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার উদাহরণও প্রাসঙ্গিক। দীর্ঘ কারাবাসের পর তিনি মুক্ত হয়ে প্রতিশোধের রাজনীতি বেছে নেননি; বরং পুনর্মিলন, প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথ বেছে নিয়েছিলেন। ইতিহাস তাঁকে সেই কারণেই অন্য উচ্চতায় বসিয়েছে। অন্যদিকে স্বৈরশাসনের পতনের পর যেসব রাজনৈতিক শক্তি আত্মসমালোচনা না করে কেবল পুরনো ক্ষমতার কাঠামো ফিরিয়ে আনতে চেয়েছে, তাদের অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি জনসমর্থন ধরে রাখতে পারেনি।
রাজনীতিতে পরাজয় অপরাধ নয়। ক্ষমতা হারানোও অপরাধ নয়। কিন্তু জনগণের ক্ষোভকে অবজ্ঞা করা রাজনৈতিক আত্মঘাতী চিন্তা। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সামনে তাই ডিসেম্বরের প্রশ্নটি আসলে শেখ হাসিনা ফিরবেন কি ফিরবেন না- এতটা সরল নয়। বড় প্রশ্ন হলো, ফিরে এসে তিনি কী নিয়ে দাঁড়াবেন? একটি নতুন রাজনৈতিক আত্মসমালোচনা- নাকি পুরনো বয়ান? একটি নতুন প্রজন্মের কাছে ক্ষমা চাওয়া- নাকি আবারও পুরনো শত্রু-বন্ধুর ভাষা? জুলাইয়ের তরুণেরা কি ভুলে যাবে? নিহতদের পরিবার কি ভুলে যাবে? আহতরা কি ভুলে যাবে? যে মা সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়েছেন, তাঁর কাছে রাজনৈতিক স্লোগানের মূল্য কতটুকু? রাজনীতি শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন নিয়ে। ক্ষমতার চেয়ার কাঠের হতে পারে, কিন্তু সেই চেয়ারে বসার মূল্য কখনো কখনো মানুষের রক্তে লেখা হয়। তাই ক্ষমতা হারানোর পর সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো আয়নায় নিজের মুখ দেখা। আমরা জানি- ‘সময় ও স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না’।
আবার ‘যে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না, ইতিহাস তাকে আবার পরীক্ষা নেয়’। আওয়ামী লীগ যদি মনে করে শুধু শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনেই তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ফিরে আসবে, তাহলে সেটি সম্ভবত সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল হবে। কোনো দল একজন ব্যক্তির সমার্থক হয়ে গেলে সেই ব্যক্তির পতন দলটির সাংগঠনিক অস্তিত্বকেও গভীর সংকটে ফেলে। শুধু ‘আমরা ফিরব’- এই স্লোগান যথেষ্ট নয়। জনগণ প্রশ্ন করবে- কেন ফিরবেন? কী নিয়ে ফিরবেন? কার কাছে জবাব দেবেন? কী পরিবর্তন করবেন? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- জনগণ কি আপনাদের আবার গ্রহণ করবে? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় দিতে পারে না।
শেখ হাসিনা যদি ডিসেম্বরের পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশে ফেরেন, সেটি হবে একটি বড় রাজনৈতিক ও আইনি ঘটনা। কিন্তু সেটিকে ‘ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে আগেই ঘোষণা করা হবে বাস্তবতার সঙ্গে রসিকতা করা। বরং সেটি হবে আদালত, আইন, জনমত ও ইতিহাসের মুখোমুখি হওয়ার প্রত্যাবর্তন। সুতরাং আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ ডিসেম্বরের দিন গোনা নয়; বরং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবা।
ডিসেম্বর আসবে, শীত নামবে, কুয়াশা পড়বে, বিজয়ের মাসে জাতীয় পতাকা উড়বে- কিন্তু যে রাজনৈতিক ট্রেনের হুইসেল শোনার জন্য কেউ কেউ কান পেতে বসে আছেন, সেটি হয়তো প্ল্যাটফর্মে আসবে না। আর এলেও যাত্রীরা আগের আসনে বসতে পারবেন কিনা, সেই সিদ্ধান্ত নেবে টিকিট পরীক্ষক নয়- বাংলাদেশের জনগণ, আইন এবং ইতিহাস। কারণ, রাজনীতির সবচেয়ে বড় আদালত শেষ পর্যন্ত জনগণের স্মৃতি।
লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক প্রভাষক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









