গণতন্ত্র হলো জনগণের শাসন ব্যবস্থা। যেখানে জনগণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভোটে সরকার নির্বাচিত হয়। রাষ্ট্রের সব নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করেন। আব্রাহাম লিংকন এটিকে জনগণের সরকার বলেছেন। বর্তমান বিশ্বে এই ব্যবস্থার জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। তবে এর কার্যকারিতা নিয়ে নানামুখী প্রশ্ন উঠছে। আজকের পৃথিবী এক ভিন্ন বাস্তবতা ফেস করছে।
২০২৬ সালের বিশ্ব গণতন্ত্র দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য হলো ‘রেইজিং হ্যান্ডস অ্যান্ড ভয়েসেস - ফস্টারিং এজেন্সি অ্যান্ড ওনারশিপ থ্রু ডেলিবারেটিভ ডেমোক্রেসি’। এটি মূলত আলোচনাভিত্তিক গণতন্ত্রের ওপর বিশেষ জোর দেয়। সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত করাই এর লক্ষ্য। জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিবছর এই দিবসটি পালিত হয়। বর্তমানে বিশ্বে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন দেশের শাসন ব্যবস্থায় স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক সূচক ক্রমশ কমছে। বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র বিশ শতাংশ এখন স্বাধীন দেশে বাস করে। রাজনৈতিক মেরুকরণ ও অবিশ্বাস এই ধারাকে তীব্র করছে। ফলে, আগামী দিনে এক বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। পৃথিবীতে আজ প্রকৃত গণতন্ত্রের কোনো দেশ খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রত্যেকটি রাষ্ট্র কোনো না কোনো স্বার্থগোষ্ঠী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
অর্থ ও ক্ষমতার জোরে শাসন ব্যবস্থা পরিচালিত হতে দেখা যায়। সাধারণ মানুষের প্রকৃত ইচ্ছা অনেক সময় প্রতিফলিত হয় না। প্রতিটি দেশেই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা স্পষ্ট রূপ ধারণ করেছে। আদর্শ রূপটি কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এমনকি আমেরিকা ও ভারতের মতো দেশেও প্রকৃত গণতন্ত্র নেই। আমেরিকার মতো দেশে নির্বাচনে পরাজিত হলে, পরাজিত পার্টি থেকে নির্দেশে ক্যাপিটাল হিলেও হামলা হয়। আমেরিকার নির্বাচনী ব্যবস্থায় কর্পোরেট অর্থের প্রভাব ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়। সেখানে বর্ণবাদ ও রাজনৈতিক মেরুকরণ চরম রূপ ধারণ করেছে। অন্যদিকে ভারত পৃথিবীর অন্যতম বিশাল জনসংখ্যার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সত্ত্বেও সেখানে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ছে। ভিন্নমতের ওপর চাপ সৃষ্টি করায় সূচকে অবনতি ঘটছে। দুটি দেশই কাঠামোগত নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান পৃথিবীতে গণতন্ত্র কলুষিত হওয়ার নানা কারণ বিদ্যমান। প্রধান কারণ হলো রাজনীতিতে কালো টাকার অবাধ ব্যবহার ও প্রভাব। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাপক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করাও এর অন্যতম বড় কারণ। এছাড়া আইনের শাসনের অভাব এই সংকটকে আরো গভীর করছে। ফলে, সাধারণ মানুষ ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে। এই ব্যবস্থার বর্তমান দূরবস্থার জন্য মূলত কতিপয় গোষ্ঠী দায়ী। সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ ও পুঁজিপতিরা এর জন্য প্রধানত দায়ী। তারা নিজেদের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় নীতি ও আইন পরিবর্তন করে। এর বাইরে কিছু দুর্নীতিপরায়ণ আমলাও সমান অপরাধী। তারা জনগণের
অধিকার খর্ব করে নিজেদের আখের গোছায়। সাধারণ মানুষ কেবল তাদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে। মানুষ এখন গণতন্ত্রের পরিবর্তে ভিন্ন কিছু ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা জনগণকে চরমভাবে হতাশ করেছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধির ফলে মানুষ বিকল্প ব্যবস্থার খোঁজ করছে। বিশ্বে স্বৈরতান্ত্রিক ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ মডেল বেশি কার্যকর মনে হচ্ছে। সাধারণ নাগরিকরা এখন অধিকারের চেয়ে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বেশি চায়। তাই তারা এই ব্যবস্থার ওপর পুরোপুরি ক্ষুব্ধ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পশ্চাৎপসরণ অত্যন্ত স্পষ্ট।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিবেদন অনুযায়ী বৈশ্বিক সূচক সর্বনিম্ন। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে এখন হাইব্রিড বা ত্রুটিপূর্ণ শাসন বিদ্যমান। মাত্র আট শতাংশ মানুষ পূর্ণ গণতন্ত্রের সুবিধা ভোগ করছে। বাকি বিশাল জনগোষ্ঠী কোনো না কোনোভাবে অধিকার বঞ্চিত। এই উপাত্ত বর্তমান বিশ্বের এক করুণ চিত্র ফুটিয়ে তোলে। গণতন্ত্রের এই দুর্দিন আমাদের গভীর আত্মোপলব্ধির সুযোগ দেয়। এটি কেবল একটি নির্বাচনী আনুষ্ঠানিকতা মাত্র নয়। এর মূল ভিত্তি হলো মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা। বর্তমান সংকট দূর করতে না পারলে বিপর্যয় নেমে আসবে। ২০২৬ সালের এই দিনে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশে আদৌ কখনো প্রকৃত গণতন্ত্র ছিল কি তা প্রশ্নসাপেক্ষ। স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশ নানা সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। বারবার সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বাধা সৃষ্টি করেছে। নব্বইয়ের দশকের পর কিছু আশা জাগলেও তা স্থায়ী হয়নি।
দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহনশীলতার অভাব সবসময় স্পষ্ট ছিল। ফলে, এ দেশে ব্যবস্থাটি কখনোই পূর্ণতা পায়নি। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে প্রকৃত গণতন্ত্র বিরাজমান বলা কঠিন। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চরম অবিশ্বাস লক্ষ্য করা যায়। রাজনৈতিক দলগুলো একটা অংশ সংশোধন অনুপস্থিত। সাধারণ মানুষ তাদের ভোটাধিকার নিয়ে এখনও শঙ্কিত থাকে। প্রশাসন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে
প্রতিনিয়ত। মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক চলছে। সার্বিক পরিস্থিতি একটি সুস্থ ধারার ইঙ্গিত প্রদান করে না। অনেকে বর্তমান অবস্থাকে সরাসরি সিন্ডিকেটিং গণতন্ত্র বলে আখ্যায়িত করেন। এর অর্থ হলো ক্ষমতা কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে বন্দি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিন্ডিকেট মিলে পুরো রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে। তারা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী বাজার ও নীতি নির্ধারণ করে। ফলে সাধারণ মানুষের অধিকার ও কণ্ঠস্বর পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়। এই সিন্ডিকেট ভাঙা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নিরপেক্ষ তথ্য ও উপাত্ত এই সিন্ডিকেটের সত্যতা প্রমাণ করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে। দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাবে দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য আকাশচুম্বী। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে দেশের অধিকাংশ সম্পদ জমা হচ্ছে। সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা প্রতিনিয়ত জীবনযুদ্ধে হেরে যাচ্ছে। এই উপাত্তগুলো আমাদের শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থা অনেক কমেছে। বিগত নির্বাচনগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সূচকে বাংলাদেশ নিচের সারিতে অবস্থান করছে। আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই সংখ্যাগুলো দেশের শাসন ব্যবস্থার এক রুগ্ন চিত্র তুলে ধরে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ চর্চায় কোনো স্বচ্ছতা নেই। বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব ও ব্যক্তিপূজা এই ব্যবস্থাকে ধ্বংস করছে। দলের সাধারণ কর্মীদের মতামতের কোনো মূল্যায়ন করা হয় না। ফলে, ত্যাগী নেতারা বাদ পড়ে অর্থশালীদের আগমন ঘটছে। এই সংস্কৃতি পুরো রাষ্ট্রকে ক্রমান্বয়ে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সার্বিকভাবে বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক গভীর সংকটের প্রতীক। শুধু সংবিধানের পাতায় লিখে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম জাতীয় ঐক্য। জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাই বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত। অন্যথায় দেশের ভবিষ্যৎ আরো অন্ধকার ও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আমাদের এখনই এই বিষয়ে সচেতন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিশ্বে ও বাংলাদেশে গণতন্ত্র বাঁচাতে দল নিরপেক্ষ নির্বাচন জরুরি। একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। যেখানে সব দল ও নাগরিকের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত থাকবে। ভোটাররা যেন নির্ভয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। স্বচ্ছ ব্যালট ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। তবেই ব্যবস্থার প্রতি জনগণের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরে আসবে। অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা অত্যন্ত জরুরি একটি পদক্ষেপ। মুষ্টিমেয় সিন্ডিকেটের হাত থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত করতে হবে।
সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা চাই। সম্পদ যেন সবার মাঝে সুষমভাবে বণ্টিত হয় তার ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা কখনো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। এটি সমাজের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহনশীলতা ও সংলাপ প্রয়োজন। সহিংসতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে সব জাতীয় সমস্যার সমাধান খোঁজা উচিত। ২০২৬ সালের বিশ্ব গণতন্ত্র দিবসে এই হোক আমাদের মূল অঙ্গীকার। বিশ্ব ও বাংলাদেশের কল্যাণেই এই ব্যবস্থার সংস্কার অপরিহার্য। তবেই সাধারণ মানুষ প্রকৃত মুক্তির স্বাদ লাভ করতে পারবে। কি অবস্থায় জনগণের প্রতি আমার আহবান- জনগণ যদি কথা না কয়, শাসন তবে তো শৃঙ্খল হয়।
ভোটের বাক্সে বন্দি অধিকার,
সিন্ডিকেটের হাতে বিশ্ব চরাচর।
তবেই মুক্ত বাতাসে আসবে আলোর দিন,
মানুষের কণ্ঠ যদি হয় শঙ্কা বিহীন।
জেগে ওঠো আজ হে পৃথিবীর প্রাণ,
মিলে গেয়ে উঠি সাম্যের জয়গান।
পরিশেষে এই বলে নিবন্ধের সমাপ্তি টানছি, গণতন্ত্রের সংকট আজ বৈশ্বিক। কেবল দিবস পালনের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান অসম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামোগত সংস্কার ও মানসিকতার পরিবর্তন। সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষাই হোক রাষ্ট্রের একমাত্র মূল লক্ষ্য। ২০২৬ সালের এই দিনে আমাদের সম্মিলিতভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। তবেই মানবসভ্যতা এক সুন্দর ও নিরাপদ পৃথিবী উপহার পাবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









