দেশে নারী-শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে গেছে। গণমাধ্যমে চোখ রাখলেই ধর্ষণের শিরোনাম চোখে পড়ে। একটি সমাজ কতটা মানবিক ও নিরাপদ, তার অন্যতম মাপকাঠি হলো সেখানে নারী ও শিশুরা কতটা নিরাপদে জীবনযাপন করতে পারে। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা বারবার সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাচ্ছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই- মাত্র সাত মাসে নারী ও শিশু ধর্ষণের ৬৪১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে নারী ধর্ষণের ঘটনা ৪০০টি এবং শিশু ধর্ষণের ঘটনা ২৪১টি। ধর্ষণের পর হত্যা হয়েছে ৩৭টি এবং ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ১৫২টি। একই সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ৬০৬টি ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। এসব সংখ্যা নিছক পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি মানুষের জীবন, একটি পরিবারের অসহায়ত্ব এবং দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ও মানসিক ক্ষত।
প্রশ্ন হচ্ছে, এত আইন, প্রতিষ্ঠান ও সহায়তা ব্যবস্থা থাকার পরও নারী ও শিশুর নিরাপত্তা কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না? বাস্তবতা হলো, দেশে আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, মনোসামাজিক সহায়তা, আশ্রয় ও পুনর্বাসনের নানা ব্যবস্থা থাকলেও সেগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। একজন ভুক্তভোগীকে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে যেতে হলে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ যেমন দীর্ঘ হয়, তেমনি বাড়ে তাঁর সময়, অর্থ ও মানসিক চাপ।
বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য এই বাস্তবতা আরো কঠিন। নথিভুক্ত ঘটনা বাস্তবতার পুরো চিত্র নয়- এই বাস্তবতাও মনে রাখা জরুরি। আইনি সহায়তার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। আবেদন প্রক্রিয়ার জটিলতা, একাধিক অনুমোদনের ধাপ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের জন্য বড় বাধা। অনলাইন আবেদন ও হেল্পলাইন থাকলেও গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেটের সীমিত সুযোগ এবং সচেতনতার ঘাটতি এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। ফলে, রাষ্ট্র যে অধিকার ও সহায়তা নিশ্চিত করেছে, বাস্তবে তার সুবিধা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন মানুষই অনেক সময় তা থেকে বঞ্চিত হন। এ বৈপরীত্য দূর করা জরুরি।
ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ও সেলের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি একই। দেশে ৯৫টি এমন কেন্দ্র ও সেল থাকার পরও যদি প্রতিটি কেন্দ্রে চিকিৎসা, ফরেনসিক পরীক্ষা, আইনি সহায়তা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন সমন্বিতভাবে নিশ্চিত না হয়, তাহলে অবকাঠামোর সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মাপার কোনো অর্থ নেই। ‘ওয়ান-স্টপ’ নামের সঙ্গে বাস্তব সেবার মিল থাকতে হবে। ২৪ ঘণ্টা সেবা, প্রশিক্ষিত জনবল, পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় ফরেনসিক সুবিধা নিশ্চিত করা তাই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ- সমন্বয়ের অভাব। নারী ও শিশু নির্যাতনের একটি ঘটনায় পুলিশ, হাসপাতাল, আদালত, আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠান, সমাজসেবা ও বেসরকারি সংস্থাকে একইসঙ্গে কাজ করতে হতে পারে। কিন্তু তাদের কাজ যদি বিচ্ছিন্ন থাকে, তাহলে ভুক্তভোগীর ওপরই সমন্বয়ের দায় চাপবে। এটি কোনো কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না। রাষ্ট্রের উচিত এমন একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা, যেখানে ভুক্তভোগীকে সেবা পাওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে না; বরং প্রতিষ্ঠানগুলোই নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করবে।
তবে প্রতিকারের পাশাপাশি প্রতিরোধেও জোর দিতে হবে। শুধু অপরাধের পর মামলা, গ্রেফতার বা বিচার নয়- কেন এসব অপরাধ ঘটছে, কোথায় ঝুঁকি বেশি, কোন জনগোষ্ঠী বেশি অসুরক্ষিত এবং কীভাবে আগেই ঝুঁকি কমানো যায়, সেসব প্রশ্নও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু কতটি আইন আছে, কতটি প্রতিষ্ঠান আছে কিংবা কতটি মামলা হয়েছে- তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, বিপদের মুহূর্তে একজন নারী বা শিশু রাষ্ট্রকে কতটা কাছে পায়। নির্যাতনের পর যদি ভুক্তভোগীকেই বিচার ও সেবার দরজা খুঁজে বেড়াতে হয়, তাহলে সুরক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য অপূর্ণই থেকে যায়। তাই এখন সময় সংখ্যা গণনার পাশাপাশি ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত ও সংশোধন করার। এমন একটি বিচার ও সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









