রাজনীতিতে দলীয় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির প্রশ্নটি নতুন নয়। তবে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী কিংবা সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার যে বার্তা সাম্প্রতিক সময়ে দৃশ্যমান হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। মিরপুরের রাড্ডা মা ও শিশুসাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও দখলের অভিযোগের পর বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা সেই আলোচনাকেই সামনে এনেছে।
ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান যে কঠোর- এমন বার্তা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো দলের ক্ষমতায় থাকা তার নেতা-কর্মীদের আইনের ঊর্ধ্বে থাকার অধিকার দেয় না। বরং ক্ষমতাসীন দলের ক্ষেত্রেই জবাবদিহির মানদণ্ড আরো স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। দলীয় পদ, সংসদ সদস্যপদ কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অপরাধের অভিযোগের ঢাল হতে পারে না।
তবে এখানেই মূল প্রশ্ন- সাংগঠনিক শাস্তি কি যথেষ্ট? কোনো নেতা পদ হারালেন, কমিটি বিলুপ্ত হলো বা কাউকে বহিষ্কার করা হলো- এসব দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু যদি কোনো ঘটনায় ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ থাকে, তাহলে তার নিষ্পত্তি হওয়া উচিত তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। অভিযুক্ত ব্যক্তি কোন দলের, কোন পদে আছেন বা সরকারের কতটা কাছের- তা যেন তদন্তের গতিপথ নির্ধারণ না করে।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনায় তাই স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত অত্যন্ত জরুরি। তদন্তে কারও সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও সমানভাবে অনুচিত। আইনের শাসনের অন্যতম মৌলিক শর্ত হলো- অভিযোগের তদন্ত হবে, প্রমাণ মূল্যায়ন হবে এবং শেষ পর্যন্ত আইনগত প্রক্রিয়ায় দায় নির্ধারিত হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি বিলুপ্ত, নেতাদের বহিষ্কার এবং পদ স্থগিতের ঘটনাও দলীয় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। এসব পদক্ষেপের আনুষ্ঠানিক কারণ যেখানে স্পষ্ট, সেখানে তা সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে নির্দিষ্ট ঘটনার যোগসূত্র না থাকলে সেটিকে সেই ঘটনার শাস্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকে না। রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি অভিযোগ রয়েছে- ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় অনেক সময় ব্যক্তিকে দায়মুক্তির এক ধরনের অঘোষিত সুবিধা দেয়। এই সংস্কৃতি বদলাতে হলে শুধু তাৎক্ষণিক শাস্তি নয়, স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দরকার। দলের ভেতরে অভিযোগ যাচাইয়ের কার্যকর কাঠামো, স্বচ্ছ তদন্ত, সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ এবং রাষ্ট্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে তাই বড় পরীক্ষা শুধু কঠোর হওয়ার নয়; কঠোরতার সঙ্গে ন্যায়সংগত ও প্রাতিষ্ঠানিক হওয়ার। নিজের দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেও অভিযোগের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা গেলে সেটি রাজনৈতিক জবাবদিহির সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু দলীয় শাস্তি যদি কখনো রাজনৈতিক বার্তা প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং অপরাধের বিচার আইনি প্রক্রিয়ায় না পৌঁছায়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
রাজনীতিতে কঠোর বার্তা প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু গণতন্ত্রে তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণই যেন সিদ্ধান্তের ভিত্তি হয়- এটাই হওয়া উচিত নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূলনীতি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









