রাজনীতিতে ক্ষমতা পাওয়া যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই ক্ষমতার সীমা কোথায় এবং তার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে দল ও রাষ্ট্র কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটি আরো গুরুত্বপূর্ণ। মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবরটি সেই কারণেই বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে।
সংশোধনের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। যথারীতি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি স্পিকারের সাথে দেখা করে তার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। সাথে সাথেই সেটি কার্যকর হয়েছে। মিষ্টি সংরক্ষিত আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। আসনটি এখন শূন্য হয়ে গেছে। রাড্ডা এমসিএইচ এফপি সেন্টারের ঘটনাটি সাধারণ কোনো ভাঙচুরের ঘটনা নয়।
২৫ সেপ্টেম্বরের রাতের ওই ঘটনায় মুখোশধারী দুই শতাধিক ব্যক্তি হামলা চালায় বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করার পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। লুট করা হয় ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, কম্পিউটার, জেনারেটরসহ বিভিন্ন সামগ্রী। একটি স্থায়ী ও তিনটি আধাপাকা ভবনও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। মামলার নথিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এক কোটি টাকার বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাড্ডা এমসিএইচ এফপি সেন্টারটি প্রায় পাঁচ দশক ধরে দরিদ্র ও অসহায় নারী ও শিশুদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছিল বলে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক জানিয়েছেন। সরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানে টিকাদান কার্যক্রমও চলত। ফলে, একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে সংঘটিত হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের প্রভাব শুধু একটি জমি বা স্থাপনার মালিকানা নিয়ে বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকারও জড়িত রয়েছে।
এই ঘটনায় ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। তিনি অবশ্য হামলা ও ভাঙচুরের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, পুলিশ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিক। অর্থাৎ অভিযোগ এবং প্রমাণকে একই বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না। কারা হামলার পরিকল্পনা করেছে, কারা সেখানে উপস্থিত ছিল, কারা অর্থ, লোকবল বা সরঞ্জাম দিয়েছে এবং কার নির্দেশে ঘটনাটি ঘটেছে, এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।
তবে রাজনৈতিক ও নৈতিক জায়গা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট। কোনো দলের পরিচয় কারও বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্তকে থামিয়ে দেওয়ার কারণ হতে পারে না। বরং ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতা, কর্মী বা জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলতে দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে দলীয়ভাবেও ব্যবস্থা নেওয়া রাজনৈতিক জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাড্ডার ঘটনায় বিএনপি দলীয় একজন সংসদ সদস্যের ত্যাগের বিষয় বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে জবাবদিহিতার রাজনীতির কাঠামোর মধ্যেই দেখা যায়।
অবশ্য ঘটনার পরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও বলেছিলেন, ঘটনায় কোনো সংসদ সদস্যের সম্পৃক্ততা তদন্তে প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে প্রত্যাহার করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছিল। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে। রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকা একজন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে দেশের প্রতিটি এলাকায়, প্রতিটি ঘটনা এবং প্রতিটি ব্যক্তির কর্মকাণ্ড সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু তিনি একটি নীতি ও কাঠামো তৈরি করে দিতে পারেন।
সেই কাঠামোর মূল কথা হতে পারে, দলীয় পদ পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখবে না। ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তদন্ত হবে, সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা হবে এবং অভিযোগকারী বা অভিযুক্ত কারও রাজনৈতিক পরিচয় বিচারপ্রক্রিয়ার বিকল্প হবে না। আমার কাছে এখানেই বিষয়টির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। যদি কোনো দল সত্যিই নিজেদের নেতা কর্মীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে চায়, তাহলে শুধু আলোচিত একটি ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট হবে না। স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত দলের পদধারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য একটি কার্যকর সাংগঠনিক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সেটি তিন, চার কিংবা পাঁচ সদস্যের একটি স্বাধীন অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণ সেল হতে পারে। তবে এমন সেলের কাজ হওয়া উচিত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ নয়, বরং অভিযোগ গ্রহণ, প্রাথমিক তথ্য যাচাই, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি পৌঁছে দেওয়া।
ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত অবশ্যই রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। এমন ব্যবস্থা থাকলে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তথ্য পৌঁছানো সহজ হবে। কোনো স্থানীয় নেতা দলীয় পদ ব্যবহার করে জমি দখল, চাঁদাবাজি, হামলা, ভাঙচুর কিংবা অন্য কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন কিনা, সে বিষয়ে সময়মতো তথ্য পাওয়া যাবে। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী ঘোষণা নয়, বরং অভিযোগকে যথাযথ তদন্তের পথে পাঠানো হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে দলীয় ব্যবস্থা এবং আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা দুটোই হতে পারে। এতে দলও জানতে পারবে কোথায় তার সাংগঠনিক দুর্বলতা রয়েছে।
আমাদের এই বাংলাদেশ রাজনীতির ইতিহাসে দলীয় পরিচয় অনেক সময় ব্যক্তির সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বাড়িয়ে দেয়। সেই প্রভাব যখন জনস্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠান নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তি। আরো বড় ক্ষতি হয় রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থায়। মানুষ যদি মনে করে ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় থাকলে অপরাধের বিচার হবে না, তাহলে আইনের শাসনের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যায়। রাড্ডার ঘটনা তাই বিএনপির জন্যও একটি সাংগঠনিক পরীক্ষার বিষয় হয়ে উঠেছিল।
একদিকে একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে , অন্যদিকে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বের উচ্চ মহলের তদন্তে সত্যতা মেলায় তার সদস্য পদ টিকিয়ে রাখতে পারলেন না। এখন পরবর্তী কথা বলবে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া। এটা নির্ভর করবে দলীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে যদি অভিযোগের রাজনৈতিক দায়ের জায়গায়ও কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়। আর কঠোর অবস্থান নিলে ভবিষ্যতের জন্য একটি নীতিগত বার্তা তৈরি করতে পারে। সেই বার্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে, দলীয় পদ ক্ষমতার ঢাল নয় এবং জনপ্রতিনিধিত্ব ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের লাইসেন্স নয়।
আমি কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নই। তাই বিএনপির এই সিদ্ধান্তকে দলীয় আনুগত্যের জায়গা থেকে দেখার প্রশ্নও নেই। একজন নাগরিক হিসেবে যে কোনো রাজনৈতিক দল যখন নিজের লোকের বিরুদ্ধেও অভিযোগের প্রেক্ষাপটে জবাবদিহির কথা বলে, সংসদ সদস্যের মতো পদ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেয়, তখন সেটি অবশ্যই আলোচনার বিষয়। একই মানদণ্ড অন্যসব রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত। আজ বিএনপির কেউ অভিযুক্ত হলে তদন্ত ও বিচার চাইব, কাল অন্য দলের কেউ অভিযুক্ত হলেও একই কথা আমি বলব। আইনের শাসনের সৌন্দর্য তো এখানেই।
শেষ পর্যন্ত রাড্ডা ঘটনায় কী ঘটেছিল, কারা পরিকল্পনা করেছিল, কারা হামলা চালিয়েছিল এবং কার কী ভূমিকা ছিল, তা নির্ধারণ করবে তদন্ত। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং ফৌজদারি দায়ও এক বিষয় নয়। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দলের জন্য এই ঘটনাটি নিজেদের ভেতরে জবাবদিহির সংস্কৃতি শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করেছে। আর এই জবাবদিহিতায় বিএনপি উতরেও গেছে।
এখন অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় কোনো সুরক্ষা না দেয় এবং একই নীতি দেশের আনাচে কানাচে দলীয় পদধারী সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সেটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। শেষ পর্যন্ত জনগণ রাজনৈতিক দলের কথার চেয়ে তাদের আচরণই মনে রাখে। সেই আচরণ যদি হয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে নিজের ঘরের লোককেও জবাবদিহির আওতায় আনা, তাহলে তার প্রভাব শুধু একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









