দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছে- সাম্প্রতিক কয়েক মাসের পরিসংখ্যান এমন একটি আশাবাদ তৈরি করেছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বরের তথ্য সেই আশায় কিছুটা ধাক্কা দিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, আগস্টে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে আসা সার্বিক মূল্যস্ফীতি সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে।
খাদ্য মূল্যস্ফীতিও একই সময়ে ৭ দশমিক ০২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সময় জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশে। অর্থাৎ, মানুষের আয় বৃদ্ধির চেয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো দ্রুত বাড়ছে।
মূল্যস্ফীতির এই পুনরুত্থানের পেছনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দশ দিনে তেলের বাড়তি দাম পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের দামে প্রভাব ফেলেছে। অর্থনীতিতে জ্বালানি এমন একটি উপাদান, যার মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি ও পরোক্ষ- দুইভাবেই অন্যান্য খাতকে প্রভাবিত করে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ, শিল্পের উৎপাদন এবং সরবরাহব্যবস্থার খরচ বাড়ে। ফলে, তেলের মূল্যবৃদ্ধির পূর্ণ প্রভাব পরবর্তী মাসগুলোতেও দেখা যেতে পারে। এখানেই নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। মূল্যস্ফীতি যখন মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে বেশি থাকে, তখন সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে এমন পরিস্থিতি চলা অর্থনীতির জন্য স্বাস্থ্যকর নয়।
শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না; মানুষের প্রকৃত আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়- দুটিকেই নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে রাখতে হবে। অন্যদিকে, জুলাই-আগস্টে পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ৩৮২ কোটি ডলারে পৌঁছানোও উদ্বেগজনক। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ঘাটতি বেড়েছে ২৯ শতাংশ। এর প্রধান কারণ, জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় দ্বিগুণ হওয়া। একই সময়ে মূলধনী পণ্য আমদানি কমেছে এবং চাল আমদানিতেও বড় পতন ঘটেছে। অর্থাৎ আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি উৎপাদনশীল বিনিয়োগের পরিবর্তে মূলত জ্বালানি ব্যয়ের চাপ থেকে এসেছে- যা অর্থনীতির জন্য কাঙ্ক্ষিত প্রবণতা নয়।
তবে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকা কিছুটা স্বস্তির কারণ। কিন্তু আর্থিক হিসাবে বড় ঘাটতি এবং জুলাই-আগস্টে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। টেকসই বৈদেশিক ভারসাম্যের জন্য রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উৎপাদনশীল আমদানি নিশ্চিত করা জরুরি।
এ অবস্থায় বিপিসির তেল আমদানির দরপত্রের সময় ৪২ দিন থেকে ২১ দিনে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত বাস্তব পরিস্থিতিতে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে। তবে দ্রুত আমদানির নামে প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও মূল্য যাচাইয়ের সুযোগ যেন সংকুচিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ- জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখা এবং মূল্যস্ফীতির দ্বিতীয় দফার চাপ ঠেকানো।
এজন্য শুধু বাজারে প্রশাসনিক নজরদারি নয়, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার অদক্ষতা কমানো, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, উৎপাদন বাড়ানো এবং নিম্ন আয়ের মানুষের সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তেলের মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কিন্তু ভোক্তা ও অর্থনীতির জন্য পূর্বানুমানযোগ্য নীতি থাকা জরুরি।
মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরে নেমে আসাকে সাফল্য বলা যাবে না, যদি মানুষের আয় তার চেয়েও কম হারে বাড়ে। অর্থনীতির প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন মূল্যস্ফীতি কমবে, প্রকৃত মজুরি বাড়বে এবং উৎপাদন ও বিনিয়োগ শক্তিশালী হবে। সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যান তাই কেবল একটি মাসের হিসাব নয়; এটি অর্থনীতির জন্য সতর্কসংকেত। এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে তেলের মূল্যবৃদ্ধির ঢেউ আরো বিস্তৃত হয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









