২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার মূল প্রত্যাশা ছিল একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা। শেখ হাসিনার পলায়নের পর অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় দেড় বছর দেশ পরিচালনা করেছে। এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এসেছে। একই দিনে হয়েছে গণভোট। জনগণ সংসদ সদস্য নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদভিত্তিক সংস্কার প্রস্তাব নিয়েও মত দিয়েছে। ফলে, নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও সাধারণ নির্বাচনের সরকারের চেয়ে অনেক বেশি।
গণভোটে সংস্কারের পক্ষে রায় এসেছে। বিএনপি নির্বাচনের আগে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ছিল। নির্বাচনের পরও দলটি সংস্কার প্রস্তাবগুলো গ্রহণের কথা বলেছে। কিন্তু নতুন সংসদ সদস্যদের শপথের সময় একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিএনপির নির্বাচিত এমপিরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। বিএনপির ব্যাখ্যা, আগে সাংবিধানিক ও আইনগত ভিত্তি তৈরি করতে হবে। অন্যদিকে জামায়াত, এনসিপিসহ কয়েকটি দলের সদস্য এবং কিছু নির্বাচিত ব্যক্তি সেই শপথ নিয়েছেন।
এখানেই গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী পথ নিয়ে প্রথম বড় বিভাজনটি দৃশ্যমান হলো। জনগণ যে সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছে, তার বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক মতভেদ তৈরি হয়েছে। আইনের দৃষ্টিতে বিএনপির যুক্তি থাকতে পারে। অন্য পক্ষেরও রাজনৈতিক যুক্তি আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন আরো সরল। ভোটের মাধ্যমে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার বাস্তব রূপ কখন দেখা যাবে? সংস্কারের পথ যত দীর্ঘ হবে, ততই মানুষের মধ্যে সন্দেহ বাড়বে। আস্থা তৈরি করতে হলে সরকারকে দ্রুত অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।
এদিকে দেশের অর্থনীতির চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বেড়েছে। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে। পরিবহনের ভাড়া বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ে। উৎপাদন খরচও বাড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও অস্বস্তি কাটেনি। আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল আরো বেশি। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।
এই চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ। বাজারে মাংস, মাছ, সবজি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুর দাম বেড়েছে। অনেকে খাবারের পরিমাণ কমিয়েছেন। কেউ বাজারের ধরন বদলেছেন। আমি নিজেও গত দুই মাস ধরে খুচরা বাজারের বদলে পাইকারি বাজার থেকে মাসের সওদা কিনছি। তাতেও আগের তুলনায় কিছুটা সাশ্রয় হচ্ছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে টাকা খরচ হতো, এখন পাইকারি বাজার থেকেও তার চেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কৃষকের অবস্থাও সহজ নয়। সার, কীটনাশক, শ্রম ও পরিবহনের ব্যয় বেড়েছে। ফলে, কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার বাজারে সবজির দাম কমলে কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই ভোক্তার স্বস্তি এবং কৃষকের ন্যায্য দাম; দুটোর মধ্যে ভারসাম্য জরুরি। সামনে শীতের সবজি বাজারে সরবরাহ বাড়লে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে। কিন্তু উৎপাদন খরচ না কমলে সেই স্বস্তি স্থায়ী হবে না। কৃষি, পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থাপনাকে একই নীতির আওতায় না আনলে এই সমস্যা থেকে বের হওয়া কঠিন।
শিল্প ও নির্মাণ খাতের অবস্থাও উদ্বেগজনক। আমার এলাকার হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, বিক্রি অনেক কমেছে। মানুষ নতুন নির্মাণে যাচ্ছে না। কেউ গেলে কাজ সীমিত রাখছে। অনেক ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান কার্যত বন্ধ। বড় কারখানাগুলোও উৎপাদন কমিয়ে চালু রাখার চেষ্টা করছে। বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকের ঋণ নিচ্ছেন না। কারণ, বাজারে চাহিদা নেই। বিদ্যুৎ, গ্যাস, কাঁচামাল ও অর্থের খরচ বেশি। ফলে, নতুন বিনিয়োগের বদলে সবাই অপেক্ষা করছে। নির্মাণ খাতের স্থবিরতার প্রভাব আরো বিস্তৃত। নতুন বাড়ির কাজ কমেছে। পুরনো ভবনের ফিনিশিং কাজ কিছুটা চলছে।
স্যানিটারি, বৈদ্যুতিক পণ্য, রঙসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোম্পানিগুলো উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। অন্যদিকে সামনে ইট তৈরির মৌসুম। অনেক ইটভাটা মালিক এবার উৎপাদনে যেতে চাইছেন না। কারণ, উন্নয়ন ও নির্মাণকাজ না থাকলে ইটের চাহিদা থাকবে না। অর্থনীতির প্রতিটি খাত যে একটি অন্যটির সঙ্গে কতটা যুক্ত, এই পরিস্থিতিই তার প্রমাণ।
ব্যাংকিং খাতেও একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। ব্যাংকে টাকা আছে। কিন্তু বিনিয়োগ নেই। জুন ২০২৬ শেষে ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্য ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। অর্থাৎ মানুষের আমানত ব্যাংকে জমা হচ্ছে। কিন্তু শিল্পপতিরা নতুন বিনিয়োগের জন্য ঋণ নিচ্ছেন না। সুদের হার কমছে। আমানতের ওপর নির্ভরশীল মানুষের আয়ও কমছে। এই পরিস্থিতি অর্থনীতির দুর্বল চাহিদারই ইঙ্গিত দেয়।
সরকারের আর্থিক চাপও কম নয়। রাজস্ব আয় প্রত্যাশা অনুসারে না বাড়লে ব্যয়ের চাপ সামলানো কঠিন হবে। নতুন অর্থবছরে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে এই ঋণ প্রয়োজন হলেও অতিরিক্ত সরকারি ঋণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে চাপ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে। তাই শুধু টাকা খরচ করলেই অর্থনীতি সচল হবে না। কোথায় ব্যয় হচ্ছে, কী ফল আসছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেলও বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। তাদের ন্যায্য বেতন প্রয়োজন। কিন্তু রাজস্ব আয় দুর্বল হলে অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেই প্রশ্নও আছে। রাস্তা, সেতু, পৌর অবকাঠামো ও গ্রামীণ সড়কের অবস্থা বহু জায়গায় খারাপ। স্থানীয় পর্যায়ে কর্মকর্তারা উপর মহলে প্রকল্প পাঠাচ্ছেন। প্রকল্প অনুমোদন হচ্ছে না, বরাদ্দও আসছে না। ফলে, মেরামতও হচ্ছে না। উন্নয়ন ব্যয় বন্ধ থাকলে শুধু রাস্তা খারাপ হয় না। স্থানীয় অর্থনীতিও থেমে যায়। শ্রমিক, ঠিকাদার, দোকানি ও পরিবহন সবাই তার প্রভাব অনুভব করে।
মৌলভীবাজারের মতো প্রবাসীনির্ভর জেলাগুলোতে ব্যাংকিং সংকটের প্রভাব আরো স্পষ্ট। অনেক প্রবাসীর বড় অঙ্কের টাকা ব্যাংকে ছিল। ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে কেউ কেউ দীর্ঘদিন আমানতের মুনাফা পাননি। কেউ মূল টাকাও তুলতে পারেননি। কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে নতুন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। তবু, আমানতকারীদের অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। ব্যাংকের প্রতি আস্থা ফেরানো তাই শুধু আর্থিক বিষয় নয়। এটি অর্থনীতির প্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনার অন্যতম শর্ত।
এর সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকিও আছে। গণঅভ্যুত্থানে পরাজিত আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার সমর্থক বিভিন্ন গোষ্ঠী দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করবে; এমন আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আবার বিরোধী দলও সরকারকে চাপে রাখতে কর্মসূচি দেবে। দখল, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও শোনা যাচ্ছে। সরকার কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন কয়েকটি পদক্ষেপ দিয়ে মানুষের আস্থা ফিরবে না। আইন সবার জন্য সমান। সেই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করাই হবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত জীবনযাপন নিয়ে মানুষের আগ্রহ আছে। তিনি অল্প খরচে দুপুরের খাবার খাওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ শুধু প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কৃচ্ছসাধন দেখতে চায় না। তারা জানতে চায়, সেই কৃচ্ছসাধনের রাষ্ট্রীয় প্রতিফলন কোথায়? বাজারে স্বস্তি কোথায়? চাকরি কোথায়? বিনিয়োগ কোথায়? মানুষের আয় কোথায়? প্রধানমন্ত্রী ১৭ বছর পর দেশে ফিরে বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান।’ এখন মানুষ সেই পরিকল্পনার বাস্তব নমুনা দেখতে চায়। নেতৃত্বের মূল্যায়ন কথায় নয়, ফলাফলে হবে।
সরকারের সামনে তাই সবচেয়ে বড় কাজ হলো স্থবিরতা ভাঙা। শিল্পে বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনতে হবে। ব্যাংকের অলস টাকা উৎপাদনশীল খাতে নিতে হবে। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে সহজ শর্তে অর্থায়ন দিতে হবে। গ্রামীণ অবকাঠামোতে দ্রুত বরাদ্দ দিতে হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে নির্বাচিত স্থানীয় প্রতিনিধিদের কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে দলীয় পরিচয়ের বদলে যোগ্য মানুষকে যোগ্য জায়গায় বসাতে হবে। তাহলেই প্রশাসনে গতি আসবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো আস্থার সংকট দূর করা। শুরুতেই একটি জাতীয় সরকার গঠন করা গেলে হয়ত রাজনৈতিক বিভাজন কিছুটা কমানো যেত। এখনো সুযোগ আছে। বিএনপি যদি গণভোটের রায়কে বাস্তব সংস্কারের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এড়িয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করে এবং অর্থনীতিকে উৎপাদন ও বিনিয়োগের পথে ফেরাতে পারে, তাহলে পরিস্থিতি বদলাবে। মানুষ সরকারকে ব্যর্থ দেখতে চায় না। মানুষ স্থিতিশীলতা চায়। উন্নয়ন চায়। নিরাপদ জীবন চায়। সরকারকে এখন প্রমাণ করতে হবে, পুরনো পথ নয়, নতুন পথেই তারা হাঁটছে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









