কিশোরদের হাতে থাকার কথা বই, খাতা ও স্বপ্নের রঙ-তুলি; অথচ সেই হাতে যখন উঠে আসে অস্ত্র, যখন বন্ধুত্বের জায়গা দখল করে আধিপত্য বিস্তারের নেশা, তখন তা শুধু একটি প্রজন্মের অবক্ষয়ের চিত্র নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য অশনিসংকেত। দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার, সংঘর্ষ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। যে বয়সে একজন কিশোরের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সেই অপরাধের অন্ধকারে তার হারিয়ে যাওয়া রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত ব্যর্থতারই প্রতিফলন।
কিশোর গ্যাংয়ের উত্থানের পেছনে রয়েছে নানা সামাজিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক কারণ। পারিবারিক অবহেলা, নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি, বেকারত্ব, মাদকের সহজলভ্যতা, সামাজিক বৈষম্য এবং অপরাধীদের প্রশ্রয় কিশোরদের অপরাধপ্রবণ করে তুলছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ধারীদের স্বার্থে কিশোরদের ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে। কখনো আধিপত্য বিস্তার, কখনো জমি দখল, কখনো প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর কাজে তাদের ব্যবহার করা হয়। ফলে অপরাধের জগতে প্রবেশের পথ তাদের জন্য আরো সহজ হয়ে উঠছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারও এ ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক ভূমিকা রাখতে পারে। দলীয় পরিচয় প্রদর্শন, অস্ত্রের মহড়া, সংঘর্ষের ভিডিও প্রচার কিংবা ভয়ভীতি সৃষ্টির মাধ্যমে কেউ কেউ নিজেদের ক্ষমতাবান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অপরাধের এমন প্রদর্শনী অন্য কিশোরদেরও আকৃষ্ট করে। তবে প্রযুক্তিকে এককভাবে দায়ী না করে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের তদারকির ঘাটতিও বিবেচনায় নিতে হবে।
কিশোর গ্যাং দমনে শুধু অভিযান, গ্রেফতার কিংবা সাময়িক শাস্তি দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অপরাধে জড়িত কিশোরদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণগুলোও চিহ্নিত করতে হবে। যারা কিশোরদের ব্যবহার করে অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তুলছে, সেই প্রাপ্তবয়স্ক পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধী কিশোরদের গ্রেফতার করা হবে, অথচ তাদের দিয়ে অপরাধ করানো ব্যক্তিরা আড়ালে থেকে যাবেন- এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঠেকানো কঠিন হবে।
এ ক্ষেত্রে পরিবারকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। সন্তানের চলাফেরা, বন্ধুবান্ধব, আচরণ ও মানসিক পরিবর্তনের প্রতি অভিভাবকদের সচেতন নজর রাখা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ বাড়াতে হবে। ঝরেপড়া কিশোরদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা, কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং কর্মমুখী দক্ষতা তৈরির উদ্যোগও প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে সক্রিয় করার মাধ্যমে কিশোরদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা যেতে পারে।
মনে রাখতে হবে, কিশোর অপরাধ দমনের অর্থ কেবল অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয়; বরং আরেকজন কিশোরকে অপরাধের পথে যাওয়া থেকে ফিরিয়ে আনা। কিশোরেরা দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক।
তাদের একটি অংশ যদি অপরাধের জালে আটকে পড়ে, তবে তার দায় শুধু তাদের একার নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও রাষ্ট্র- সব পক্ষকেই নিজেদের দায়িত্ব পালনে আন্তরিক হতে হবে।
কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে অপরাধের সঙ্গে আপস করা যাবে না, আবার পথভ্রষ্ট কিশোরদের ফিরিয়ে আনার সুযোগও বন্ধ করা যাবে না। অপরাধের পৃষ্ঠপোষকদের দমন, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং কিশোরদের জন্য শিক্ষা, খেলাধুলা ও কর্মমুখী বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে না পারলে আজকের পথভ্রষ্ট কিশোরই আগামী দিনের আরো বড় অপরাধচক্রের অংশ হয়ে উঠতে পারে। সেই আশঙ্কা এড়াতে সময়ক্ষেপণ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও দৃঢ় পদক্ষেপ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









