ব্যাংকিং খাত একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে ব্যাংকের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু ঋণ বিতরণে অনিয়ম, দুর্বল তদারকি, সুশাসনের অভাব এবং ঋণ আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করে তুললে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতিতে। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা এখন এমনই এক গুরুতর সংকটে পরিণত হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে পরিকল্পনা গ্রহণের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮১ হাজার ২৩৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৩১ দশমিক ৪১ শতাংশ। এর আগে ৩১ মার্চ পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ১৩১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এ পরিসংখ্যান ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কতটা গভীর, তা স্পষ্ট করে। মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি হয়ে পড়া শুধু ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার জন্যই হুমকি নয়, বরং আমানতকারীদের আস্থা, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও উদ্বেগজনক।
এ বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী এক বছরের মধ্যে যেসব ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেসব ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে প্রতি তিন মাস অন্তর আলোচনা করার পরিকল্পনা নিয়েছে। পাশাপাশি শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অগ্রগতি পর্যালোচনা, ঋণ পুনরুদ্ধার কৌশলবিষয়ক নির্দেশিকা প্রণয়ন এবং ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা হালনাগাদ করার উদ্যোগও রয়েছে। এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ঋণ আদায়ে গতি আসতে পারে। তবে শুধু বৈঠক, নির্দেশনা ও কর্মপরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ থাকলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না। প্রতিটি ব্যাংকের জন্য পরিমাপযোগ্য আদায় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং ব্যর্থতার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
খেলাপি ঋণের সমস্যাকে কেবল ঋণ আদায়ের সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঋণ অনুমোদনের মান, ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাই, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা এবং রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের প্রশ্ন। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের অনুকূলে নিয়মের ব্যত্যয়, যথাযথ জামানত যাচাই না করা এবং ঋণ তদারকিতে অবহেলা ঋণখেলাপির ঝুঁকি বাড়ায়। তাই ঋণ বিতরণের শুরু থেকেই কঠোর যাচাই-বাছাই, ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যবহার হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ এবং আগাম ঝুঁকি শনাক্ত করার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
ঋণখেলাপি হওয়ার পর তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি খেলাপি ঋণ সৃষ্টির পথ বন্ধ করাই হওয়া উচিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক ঋণ ব্যবস্থাপনা কাঠামো শক্তিশালী করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার গুরুত্বও অনেক। ঋণ অনুমোদন থেকে শুরু করে তদারকি, আদায় ও শ্রেণিকরণ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায়ের আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকর করা জরুরি।
খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের তালিকা প্রকাশের আইনগত দিক পর্যালোচনার উদ্যোগও তাৎপর্যপূর্ণ। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাঁদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে তালিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্যের নির্ভুলতা, যথাযথ যাচাই, আইনি প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ন্যায্য অধিকার সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের বৈষম্য থাকা চলবে না। ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতা থেকে শুরু করে প্রভাবশালী বড় ঋণগ্রহীতা—সবার ক্ষেত্রেই আইন সমভাবে প্রয়োগ করতে হবে। আইন প্রয়োগে নির্বাচিত কঠোরতা নয়, বরং ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ অবস্থানই ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তাই আশাব্যঞ্জক হলেও এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দৃঢ়তা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর। খেলাপি ঋণ কমানোর নামে শুধু পুনঃতফসিল বা সাময়িক সুবিধা দিয়ে সমস্যাকে আড়াল করা যাবে না।
প্রয়োজন প্রকৃত ঋণ আদায়, অনিয়মের দায় নির্ধারণ, নতুন খেলাপি ঋণ সৃষ্টি প্রতিরোধ এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীদের স্বার্থ রক্ষা। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা গেলে আমানতকারীদের আস্থা বাড়বে, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হবে এবং অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী হবে। অতএব, এখন সময় পরিকল্পনাকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দেওয়ার— যাতে খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগ কেবল নীতিপত্রে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের আর্থিক খাতে কার্যকর পরিবর্তন আনতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









