ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো সেপ্টেম্বরে প্রশান্ত মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে বলে সোমবার জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা।
বিশ্বের আবহাওয়ার পূর্বাভাসদাতারা কয়েক মাস ধরেই সতর্ক করে আসছেন, এবারের এল নিনো সম্ভবত পর্যবেক্ষণকালের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠবে। বছরের শেষ দিকে এর সম্ভাব্য সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছানোর আগেই সর্বশেষ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে।
প্রাকৃতিক জলবায়ুচক্রের উষ্ণ পর্যায় এল নিনো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তন ঘটে, যা খরা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে আরও তীব্র করতে পারে।
কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের বরাতে প্যারিস থেকে এএফপি জানায়, প্রশান্ত মহাসাগরের এল নিনো পর্যবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ‘নিনো ৩.৪’-এ গত মাসে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা সর্বকালের সর্বোচ্চ ২৯ দশমিক ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়।
ইইউর এ পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানায়, এই তাপমাত্রা ১৯৮২-১৯৮৩, ১৯৯৭-১৯৯৮ এবং ২০১৫-২০১৬ সালের শক্তিশালী এল নিনো ঘটনাগুলোর সর্বোচ্চ তাপমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এটি ‘বর্তমান এল নিনোর ব্যতিক্রমী তীব্রতার বিষয়টি তুলে ধরছে’।
তবে এএফপিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে কোপার্নিকাস বলেছে, ‘বর্তমান এল নিনোই এ পর্যন্ত নথিভুক্ত সবচেয়ে শক্তিশালী- এ কথা বলার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো আমাদের হাতে নেই।’
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় সাম্প্রতিক এল নিনো ঘটনাগুলো অতীতের ঘটনাগুলোর তুলনায় বেশি শক্তিশালী বলে মনে হতে পারে। এতে ঐতিহাসিক তুলনা জটিল হয়ে পড়ে।
কোপার্নিকাস জানায়, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তারা একটি নতুন সূচক গ্রহণ করেছে। ওই সূচক অনুযায়ী, বর্তমান এল নিনো এখনো অতীতের ঘটনাগুলোর চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি।
তবে সংস্থাটি এএফপিকে বলেছে, সেপ্টেম্বরে পর্যবেক্ষণ করা মানগুলো ‘ইতোমধ্যে একটি ব্যতিক্রমী শক্তিশালী এল নিনোর ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিশেষ করে এই বিবেচনায় যে ঘটনাটি এখনো সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছায়নি’।
এল নিনোর তীব্রতা পরিমাপে সব আবহাওয়ার পূর্বাভাসদাতা একই মানদণ্ড ব্যবহার করেন না।
শুক্রবার জাপানের আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, এল নিনোর পরিস্থিতি ‘নথিভুক্ত ইতিহাসের সর্বোচ্চ তীব্রতায়’ পৌঁছেছে। এ ঘটনার পর্যবেক্ষণ অঞ্চলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
সমুদ্রের তাপমাত্রায় নতুন রেকর্ড: এল নিনো আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেপ্টেম্বরে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা রেকর্ড ২১ দশমিক ০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়।
কোপার্নিকাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের একই মাসে রেকর্ড করা আগের সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ৯২ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে ছাড়িয়ে গেছে এটি।
ইইউর এ সংস্থা জানায়, সামগ্রিকভাবে বিশ্বে এ পর্যন্ত নথিভুক্ত দ্বিতীয় উষ্ণতম সেপ্টেম্বর ছিল গত মাসটি। এ সময় ভূপৃষ্ঠসংলগ্ন বায়ুর গড় তাপমাত্রা ছিল ১৬ দশমিক ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
১৮৫০ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত সময়কে প্রাক্-শিল্প যুগের গড় তাপমাত্রার ভিত্তিকাল হিসেবে ধরা হয়। সেই সময়ের গড়ের তুলনায় গত সেপ্টেম্বর ১ দশমিক ৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ ছিল।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সীমিত রাখতে ২০১৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে দেশগুলো বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রাক্-শিল্প যুগের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ‘অনেক নিচে’ রাখার পাশাপাশি তা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার প্রচেষ্টা চালানোর বিষয়ে একমত হয়।
তবে জাতিসংঘ সেপ্টেম্বরে ঘোষণা করেছে, দীর্ঘমেয়াদে উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার লক্ষ্যমাত্রা কয়েক বছরের মধ্যেই অতিক্রান্ত হবে।
কোপার্নিকাসের পরিচালক কার্লো বুয়োনতেম্পো এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা আবারও এমন একটি সময়পর্বে প্রবেশ করেছি, যখন মাসের পর মাস তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকছে। আর শক্তিশালী এল নিনো এখনো তীব্রতর হওয়ায় এ পরিস্থিতি ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘প্যারিস চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি সীমা অতিক্রম করা এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। আমরা কতটা বেশি উষ্ণতার মুখোমুখি হব এবং কত দিন তা স্থায়ী হবে, তা এখনো আমাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।’
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করে উষ্ণতা যত দিন বেশি থাকবে, সেই সময়কাল কমিয়ে আনতে এবং যত দ্রুত সম্ভব তাপমাত্রা আবার নিচে নামাতে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এবারের এল নিনো ২০২৭ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে নতুন রেকর্ডে নিয়ে যেতে পারে।
এল নিনোর কারণে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের উপরিভাগের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন ঘটে।
সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো দেখা দেয় এবং এটি প্রায় নয় থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









