ক্ষমতায় থাকা মানে শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া নয়, বরং জনগণের আস্থা, প্রত্যাশা ও অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার করা।
ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতা-কর্মীর অনিয়ম, দুর্নীতি, দখলবাজি কিংবা চাঁদাবাজির দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরও বর্তায়। তাই সরকার ও দল পরিচালনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া সময়ের দাবি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও দলীয় নেতাদের যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, তা এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। তবে, কঠোর অবস্থানের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে ঘোষণায় নয়, তার নিরপেক্ষ ও কার্যকর বাস্তবায়নে।
ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেন, তবে তা কেবল দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়; রাষ্ট্রের আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতিও চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, দখল, চাঁদাবাজি, প্রভাব বিস্তার এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ক্ষমতাসীন দলের কেউ অপরাধে জড়ালে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় যেন কোনোভাবেই সুরক্ষাকবচ না হয়। একইভাবে বিরোধী দলের কোনো ব্যক্তি অপরাধে অভিযুক্ত হলে তাঁর ক্ষেত্রেও আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
ফেরদৌসী আহমেদের পদত্যাগ, ঢাকা মহানগর উত্তরের বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কমিটি ভেঙে দেওয়া এবং কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কারের মতো পদক্ষেপ দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার আলোচনায় এসেছে। এসব সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যে সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে চাইছে, তা স্পষ্ট। তবে পদত্যাগ, বহিষ্কার কিংবা কমিটি বিলুপ্ত করাই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। অপরাধের অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।
সাংগঠনিক শাস্তি ও আইনি বিচারের মধ্যে পার্থক্যও বজায় রাখতে হবে। এখানে সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা রয়েছে। অপরাধের অভিযোগে কাউকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ছাড় দেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি অভিযোগ প্রমাণের আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করাও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। গ্রেফতার, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় আইনি বিধান অনুসরণ করতে হবে। বিরোধী দলের নেতাদের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া জরুরি। আইন প্রয়োগে বৈষম্যের অভিযোগ তৈরি হলে সরকারের কঠোর অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হবে।
সরকার পরিচালনায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের দায়িত্বশীলতার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভুল সিদ্ধান্ত, দায়িত্বহীন বক্তব্য কিংবা প্রশাসনিক ব্যর্থতা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সমস্যা নয়; এর দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরও বর্তায়। তাই নিয়মিত তদারকি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা, দায়িত্ব বণ্টনের স্পষ্টতা এবং ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। জনগণের সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে দক্ষতা, সততা ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একই সঙ্গে বিরোধী দলের কর্মসূচি ও বক্তব্য পর্যবেক্ষণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের সমালোচনা ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ। কোনো বক্তব্য সরকারের কাছে অস্বস্তিকর হলেই তাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে; অন্যথায় রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
বিশেষ কোনো নাম দিয়ে অভিযান পরিচালনার পরিবর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীর সমন্বিত তৎপরতা বাড়ানোর নীতি কার্যকর হতে পারে। তবে অভিযানের নাম বা প্রচারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এর ফলাফল। অপরাধ কমছে কিনা, সাধারণ মানুষ নিরাপদ বোধ করছেন কিনা, অভিযোগের প্রতিকার হচ্ছে কিনা এবং অপরাধীরা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে বিচারের আওতায় আসছেন কিনা- এসব সূচকেই সরকারের কার্যক্রমের মূল্যায়ন হওয়া উচিত।
শেষ পর্যন্ত সরকারের কঠোরতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। দলীয় পরিচয়ে অপরাধ করার সুযোগ বন্ধ করা, প্রশাসনকে নিরপেক্ষ রাখা এবং মন্ত্রী থেকে তৃণমূলের কর্মী পর্যন্ত প্রত্যেককে নিজ নিজ কাজের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনা গেলে ঘোষিত শৃঙ্খলা বাস্তব রূপ পাবে। মনে রাখতে হবে, ভয় দেখিয়ে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়, কিন্তু স্থায়ী জনআস্থা অর্জন করতে হয় ন্যায়বিচার ও সুশাসনের মাধ্যমে।
প্রধানমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্বের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ শুধু কঠোর বার্তা দেওয়া নয়; বরং সেই বার্তার প্রয়োগে কোনো পক্ষপাত না করা। রাষ্ট্রের কাছে ব্যক্তি বা দলের পরিচয় নয়, আইনের মর্যাদাই হোক সর্বোচ্চ- এ নীতির বাস্তবায়নেই সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ও গণতন্ত্রের শক্তি নির্ধারিত হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









