অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি কেবল প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে নয়, বরং মানুষের জীবনযাত্রার স্বস্তি, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা ও ক্রয়ক্ষমতার স্থিতিশীলতায় প্রতিফলিত হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন এই তিন ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একদিকে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের গতি ধরে রাখা, অন্যদিকে ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ- দুই চ্যালেঞ্জই সামাল দিতে হচ্ছে সরকারকে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নতুন পূর্বাভাস পরিস্থিতিকে আরো উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
সংস্থাটির আশঙ্কা, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে, বিপরীতে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে সরকারের আলোচনা নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুললেও অর্থনীতির সংকট উত্তরণে শুধু বৈদেশিক সহায়তার প্রত্যাশায় থাকলে চলবে না। প্রয়োজন সময়োপযোগী নীতি, কার্যকর সংস্কার এবং বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা।
বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা চেয়ে সরকারের আলোচনা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, এ বিষয়ে আলোচনা চলমান এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আরো কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সহযোগিতার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও আলোচনাকে বাস্তব অর্থপ্রাপ্তির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। অর্থসহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়া এবং সেই অর্থ ছাড় ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ফলে, সম্ভাব্য সহায়তার ওপর নির্ভর করে বসে না থেকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের কাজ এগিয়ে নিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় মূল্যস্ফীতি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। আয় বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য না থাকলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোকে খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। বিবিএসের হিসাবে গত সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অন্যদিকে আইএমএফের পূর্বাভাসে পুরো অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দুটি পরিসংখ্যানের হিসাবপদ্ধতি আলাদা হলেও মূল্যস্ফীতির চাপ যে এখনো অর্থনীতির বড় সমস্যা, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, সরবরাহব্যবস্থার মধ্যবর্তী অযৌক্তিক ব্যয় কমানো, বাজার তদারকি জোরদার করা এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ও বিতরণব্যবস্থায় সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকতে হবে। শুধু সুদের হার বৃদ্ধি কিংবা প্রশাসনিক নজরদারির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষাও জোরদার করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বেসরকারি বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়, নীতিগত জটিলতা এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা দূর করা না গেলে শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে প্রত্যাশিত গতি আসবে না। বিশেষ করে, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নীতির ধারাবাহিকতা, সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
এ অবস্থায় বিশ্বব্যাংকের সম্ভাব্য সহায়তা কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ বা সহায়তার অর্থ যেন অনুৎপাদনশীল ব্যয়ে অপচয় না হয়, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, উৎপাদনশীল খাতের উন্নয়ন এবং অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে কাজে লাগে, তা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থের ব্যবহার ও শর্তাবলি সম্পর্কে স্বচ্ছতা বজায় রেখে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আইএমএফের পূর্বাভাসকে অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং একে অর্থনীতির বিদ্যমান দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারে গতি আনার সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সরকারের আশাবাদ তখনই বাস্তব রূপ পাবে, যখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষিত থাকবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও শক্তিশালী করার মূল দায়িত্ব সরকারেরই। তাই কেবল বৈদেশিক সহায়তার প্রত্যাশা কিংবা আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, সুশাসন, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক নীতির সুফল যেন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রতিফলিত হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। এ জন্য প্রয়োজন সমন্বিত অর্থনৈতিক কৌশল, বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা এবং তার দৃশ্যমান বাস্তবায়ন। বিশ্বব্যাংকের সম্ভাব্য সহায়তা এই প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী করতে পারে, তবে অর্থনীতির টেকসই পুনরুদ্ধার নির্ভর করবে দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









