শুরু হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। পূজার ছুটিতে শহরের কর্মস্থল ছেড়ে অনেকে গ্রামের বাড়িতে যাবেন। কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে দূরের পথে পাড়ি দেবেন, কেউ আবার পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে বের হবেন। উৎসবের আমেজে মুখর হয়ে উঠবে নগর, গ্রাম ও জনপদ। কিন্তু এই আনন্দযাত্রার সময় সড়কে যেন কোনো পরিবার স্বজন হারিয়ে শোকে ডুবে না যায়, সেদিকেও আমাদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে।
কারণ, বাংলাদেশে উৎসব মানেই অতিরিক্ত মানুষের চলাচল, সড়কে যানবাহনের চাপ এবং দীর্ঘপথে যাত্রার প্রবণতা। আর এই বাড়তি চলাচলের সঙ্গে বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। ঈদের সময়ের সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানই এর বড় প্রমাণ। ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরের সময় ১৪ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ১৫ দিনে দেশে ৩৭৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ২৯৮ জন নিহত এবং দুই হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
নিহতদের মধ্যে ৬৭ জন ছিল শিশু এবং ৪৬ জন নারী। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাতেই নিহত হয়েছেন ১১৬ জন, যা মোট প্রাণহানির প্রায় ৩৯ শতাংশ। ঈদুল আজহার চিত্রও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে ২০২৬ সালের ২১ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত ১৩ দিনে ২৯২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮১ জন নিহত ও ৮৩৭ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৪৮ জন শিশু ও ৩৪ জন নারী। এসব দুর্ঘটনার প্রায় অর্ধেকের সঙ্গে মোটরসাইকেল জড়িত ছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, ২১ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত ঈদুল আজহার ১৫ দিনের যাত্রায় ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০২ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৯৪ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ, উৎসবকেন্দ্রিক বাড়তি যাত্রার সময় সড়কে প্রাণহানির ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ, তা পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি- দুর্ঘটনার হিসাব নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কারণ, তাদের তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি, সময়সীমা ও উৎস এক নয়। কিন্তু সংখ্যার পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই- উৎসবের সময় অতিরিক্ত যাত্রা ও অনিয়ন্ত্রিত সড়ক ব্যবস্থাপনা মানুষের জীবনের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। ২০২৫ সালের সামগ্রিক চিত্রও উদ্বেগজনক। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ওই বছর দেশে ৭ হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১ হাজার ৮ জন শিশু এবং ৯৬২ জন নারী। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৬৭১ জন। তাই দুর্গাপূজার মতো উৎসব সামনে রেখে প্রশ্নটি হওয়া উচিত- আমরা কীভাবে আনন্দের যাত্রাকে নিরাপদ করব?
দীর্ঘপথে যাত্রী পরিবহনে ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন যেন কোনোভাবেই চলতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। ঈদের মতো পূজাতেও অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের জন্য বাস, মিনিবাস কিংবা অন্যান্য যানবাহনে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া যাবে না। ছাদে যাত্রী বহন এবং ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাত্রী ওঠানো-নামানো বন্ধ করতে হবে।
চালকদের ওপর বাড়তি চাপ দেওয়া যাবে না। উৎসবের আগে ও পরে দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়া ডিউটি করা এবং দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। চালকের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও বিশ্রাম নিশ্চিত করা জরুরি। মোটরসাইকেল চলাচলের ক্ষেত্রে আরো সতর্ক হতে হবে। সাম্প্রতিক ঈদযাত্রার তথ্য বলছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা প্রাণহানির বড় একটি অংশ তৈরি করছে। তাই হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিং এবং একসঙ্গে একাধিক যাত্রী বহনের প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে, তরুণদের মধ্যে নিরাপদ মোটরসাইকেল চালানোর বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
পূজামণ্ডপকেন্দ্রিক সড়ক ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। বড় মণ্ডপের আশপাশে অস্থায়ী ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা এবং যানবাহন নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বিত কার্যক্রম থাকা দরকার। মণ্ডপে যাওয়ার পথে যেন পথচারী ও যানবাহন একই জায়গায় বিশৃঙ্খলভাবে চলাচল না করে, সেদিকে নজর দিতে হবে।
উৎসবের সময় মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। শুধু দুর্ঘটনার পর মামলা কিংবা জরিমানা নয়, দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোথায় অতিরিক্ত গতি, কোথায় ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, কোথায় পথচারীর চাপ বেশি- এসব চিহ্নিত করে আগাম ব্যবস্থা নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সড়ক নিরাপত্তাকে শুধু উৎসবকালীন ব্যবস্থাপনা হিসেবে দেখলে চলবে না। ২০২৫ সালের বার্ষিক পরিসংখ্যানই দেখাচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশে একটি স্থায়ী জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সংকট। তাই উৎসবের সময় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি এবং দক্ষ চালক নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের উৎসবের আনন্দ কারও কান্নার কারণ হতে পারে না। একটি পরিবারের কাছে একজন মানুষের জীবনই সবচেয়ে মূল্যবান। ঈদ হোক, পূজা হোক কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসব হোক- উৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সবাই নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে।
আমরা চাই, পূজার আনন্দে আলোকিত হোক প্রতিটি মণ্ডপ, প্রতিটি বাড়ি ও প্রতিটি মানুষের মুখ। কোনো উৎসব শেষে যেন সংবাদপত্রের পাতায় শুধু দুর্ঘটনায় নিহত মানুষের সংখ্যা না থাকে; বরং থাকে নিরাপদে ঘরে ফেরার গল্প। উৎসবের আনন্দ হোক জীবনের জন্য, মৃত্যুর কারণ হওয়ার জন্য নয়। সড়কে একটি প্রাণও যেন উৎসবের আনন্দ কেড়ে নিতে না পারে- এই হোক আমাদের সবার অঙ্গীকার।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









