কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো, সারের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা এবং কৃষি খাতে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই সার ডিলার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু সেই নিয়োগপ্রক্রিয়াকে ঘিরে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
প্রায় পাঁচ হাজার ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ৪৭ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়ার পর বিভিন্ন এলাকায় যোগ্য প্রার্থীদের বাদ পড়া, রাজনৈতিক নেতাদের আত্মীয়স্বজনের নিয়োগ এবং অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ পাওয়ার অভিযোগ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তে প্রমাণিত হওয়া জরুরি। তবে, এসব অভিযোগের ব্যাপকতা নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ অনুযায়ী, কোথাও কোথাও ডিলারশিপ পেতে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেনের যে হিসাব সামনে এসেছে, তা শত শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে। তবে এই অঙ্ককে প্রমাণিত ঘুষের পরিমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। প্রকৃত চিত্র জানতে প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ এবং নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্রের যাচাই।
রাজশাহী, মেহেরপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নাটোর ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ, বিক্ষোভ ও স্মারকলিপি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কোথাও রাজনৈতিক নেতাদের পরিবারের সদস্যদের ডিলারশিপ পাওয়ার তথ্য সামনে এসেছে, কোথাও অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা বাদ পড়ার অভিযোগ করেছেন। আবার, কিছু এলাকায় সার সরবরাহে বিঘ্ন এবং সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। এসব ঘটনা সত্য হলে তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবেন সাধারণ কৃষক।
সার কোনো সাধারণ পণ্য নয়; এটি দেশের খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। কৃষকের কাছে সময়মতো, ন্যায্যমূল্যে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক বিবেচনা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা অবৈধ অর্থের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হলে কৃষির মৌলিক স্বার্থই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই ডিলার নিয়োগে কে কোন দলের সমর্থক, সেটি নয়; বরং কে নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেন, কার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা রয়েছে এবং কে কৃষকের কাছে নিয়ম মেনে সার পৌঁছাতে পারবেন- সেটিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য।
সরকারের উচিত অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা। প্রতিটি জেলার নিয়োগ তালিকা, আবেদনকারীদের যোগ্যতা মূল্যায়নের নম্বর, সুপারিশের ভিত্তি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ করতে হবে। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ পুনর্বিবেচনা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সার সরবরাহ, মজুত, মূল্য এবং বিক্রির ওপর নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে।
সার ডিলার নিয়োগের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কৃষকের দোরগোড়ায় ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছে দেওয়া, কোনো গোষ্ঠীর আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা নয়। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণসাপেক্ষ হলেও জনমনে তৈরি হওয়া অবিশ্বাস দূর করার দায়িত্ব সরকারের। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই এই সংকটের সমাধান সম্ভব।
কৃষকের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ, কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা খাদ্যনিরাপত্তা, বাজারদর এবং সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়ে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









