ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে যা খুশি করা এবং যা ইচ্ছা দখল করে নেওয়ার নীতি দীর্ঘ মেয়াদে দেশটির জন্য সুফল বয়ে আনবে না। বরং এতে নৈতিক অবস্থান দুর্বল হবে। উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে এক আলোচনায় এমন মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে ইসরায়েলের ইতিহাস, ফিলিস্তিনিদের ভূমির অধিকার এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার কঠিন বাস্তবতা।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্ট থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট গ্রহণ করতে গিয়ে সাংবাদিক সুসান ম্যাকের সঙ্গে আলাপচারিতায় অংশ নেন ওবামা। সেখানে ইসরায়েল রাষ্ট্রের ইতিহাসজুড়ে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে দেশটির আচরণের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ইসরায়েল ‘মানুষের কাছ থেকে জমি কেড়ে নিয়েছে এবং বাড়াবাড়ি করেছে’। ফিলিস্তিনিদের এই অভিজ্ঞতা থেকেই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও প্রতিরোধের জন্ম হয়েছে বলে তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ফিলিস্তিনিদের প্রতিক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ওবামা বলেন, ইসরায়েলে ইহুদিদের সাংস্কৃতিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিনিরা স্বাভাবিকভাবেই বলেছে, ‘এটা অবিচার, আমি আমার জমি ফেরত চাই।’
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ম্যাকের প্রশ্নের জবাবে ওবামা বলেন, ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যে বৈরিতা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য একটি ‘প্রকৃত বিরতি’ বা সংঘাত থামানোর প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয়। তার বক্তব্যে স্পষ্ট, সামরিক শক্তি দিয়ে তাৎক্ষণিক সুবিধা অর্জন আর স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান প্রতিষ্ঠা এক বিষয় নয়।
ওবামা স্মরণ করিয়ে দেন, হাজার হাজার বছর ধরে ইহুদিরা নিপীড়ন, বৈষম্য ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এর বড় অংশের জন্য দায়ী ছিল ইউরোপ। নিপীড়নের সেই ইতিহাস থেকে নিরাপদ আশ্রয় খোঁজার ইহুদিদের আকাঙ্ক্ষাকে তিনি স্বাভাবিক বলেই উল্লেখ করেন। কিন্তু অতীতের নির্যাতনের অভিজ্ঞতা বর্তমানের সব কর্মকাণ্ডের অবাধ অনুমতি হতে পারে না।
ওবামার ভাষায়, ইসরায়েল যদি মনে করে, এখন তারা অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত দেশ; তাই নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যা প্রয়োজন, তা-ই করবে এবং অন্যদের কাছ থেকে যা ইচ্ছা কেড়ে নেবে, কোনো ছাড় দেবে না—তাহলে স্বল্প মেয়াদে হয়তো সেই নীতি কাজ করতে পারে। কিন্তু এমন অবস্থান নিলে দেশটি ‘নৈতিক অবস্থান হারাবে’।
‘দ্য আইরিশ টাইমস’–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনায় ওবামা এ কথাও উল্লেখ করেন যে অঞ্চলটির লাখ লাখ ইহুদি ও ফিলিস্তিনি কোথাও চলে যাচ্ছে না। অর্থাৎ, কোনো পক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে কিংবা জোর করে সরিয়ে দিয়ে এই সংঘাতের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
ইসরায়েলের নাগরিকদের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন রাখেন, তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিরা এই অঞ্চলে কীভাবে জীবন কাটাবে, তা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। তারা কি দেয়ালের আড়ালে থেকে চারপাশের সবাইকে ধ্বংস করার চেষ্টা করবে, নাকি নৈতিকতা ও ন্যায়বোধ বজায় রেখে আত্মরক্ষার কোনো পথ খুঁজবে?
ফিলিস্তিনিদের প্রতিও ওবামার বার্তা ছিল বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার। ইসরায়েলিদের চেয়ে বেশি মানুষ হত্যা করে কিংবা আরও বেশি অস্ত্রের অধিকারী হয়ে ফিলিস্তিনিরা লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। পরিবর্তনের জন্য অন্য পথ খুঁজতে হবে, যার মধ্যে অহিংস কৌশলও রয়েছে। তবে এমন পরিবর্তন রাতারাতি আসবে না—এ কথাও স্বীকার করেন তিনি।
ওবামার বক্তব্যে তাই দুটি বিষয় পাশাপাশি এসেছে: ইহুদিদের ঐতিহাসিক নিপীড়নের স্বীকৃতি এবং ফিলিস্তিনিদের ভূমি ও ন্যায়বিচারের দাবির স্বীকৃতি। তার যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে এই উপলব্ধি—নিরাপত্তা কেবল সামরিক আধিপত্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। যে শান্তিতে অন্য পক্ষের অধিকার ও অস্তিত্বের স্বীকৃতি নেই, তা শেষ পর্যন্ত সংঘাতকেই দীর্ঘায়িত করে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









