ভালোবাসা কি এমন কিছু, যা হঠাৎ ঘটে যায়? নাকি এটি এমন এক শিল্প, যা শিখতে হয়?
আমরা ভালোবাসা নিয়ে কথা বলি। ভালোবাসার জন্য অপেক্ষা করি। কখনো ভালোবাসা হারিয়ে শোক করি, কখনো তাকে ফিরে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠি। অথচ খুব কম মানুষই ভাবে, ভালোবাসতে শেখারও প্রয়োজন আছে।
আমাদের ধারণা, ভালোবাসা একটি অনুভূতি। এমন কিছু, যা একদিন এসে আমাদের স্পর্শ করবে। আমরা প্রস্তুত থাকি সেই আগমনের জন্য, কিন্তু প্রস্তুত হই না ভালোবাসার জন্য। যেন দরজায় কেউ কড়া নাড়লেই ভালোবাসা শুরু হবে। দরজা খোলার পর কী করতে হয়, তা আর শেখার দরকার নেই। কিন্তু ভালোবাসা যদি একটি শিল্প হয়, তাহলে তারও জ্ঞান চাই, অনুশীলন চাই, সময় চাই। যেমন সংগীতের জন্য কান তৈরি করতে হয়, যেমন ছবি আঁকার জন্য চোখকে শিখতে হয় দেখতে, তেমনি ভালোবাসার জন্যও নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। আমাদের সময়ে মানুষ অনেক কিছু শিখতে চায়। কীভাবে সফল হতে হয়, কীভাবে অর্থ উপার্জন করতে হয়, কীভাবে অন্যদের চোখে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে হয়। কিন্তু ভালোবাসতে শেখার প্রশ্নটি প্রায়ই তার কাছে অদৃশ্য থেকে যায়।
আমরা জানতে চাই, কীভাবে ভালোবাসা পাওয়া যায়। খুব কমই জানতে চাই, কীভাবে ভালোবাসতে হয়। এই দুই প্রশ্নের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ব্যবধান আছে। অথচ সেই ব্যবধানের মধ্যেই হয়তো আমাদের সমস্ত ভুল বোঝাবুঝি জমে আছে ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য হয়ে উঠতে আমরা নিজেদের সাজাই। কেউ অর্থ, ক্ষমতা ও সামাজিক সাফল্যের দিকে ছুটে যায়। কেউ নিজের শরীর, পোশাক, সৌন্দর্য কিংবা আচরণকে এমনভাবে গড়ে তোলে, যাতে অন্যের চোখে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠা যায়। আমরা শিখি কীভাবে পছন্দনীয় হতে হয়, কীভাবে প্রশংসা পেতে হয়, কীভাবে অন্যদের মনে নিজেদের জন্য জায়গা তৈরি করতে হয়। কিন্তু আকর্ষণীয় হওয়া আর ভালোবাসতে পারা কি একই কথা? কেউ আমাদের দিকে তাকাল। কেউ আমাদের চাইল। কেউ আমাদের ছাড়া থাকতে পারল না। এসবের কোনোটিই নিজে থেকে প্রমাণ করে না যে আমরা ভালোবাসতে জানি। আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র হওয়া আর অন্য একজন মানুষের অস্তিত্বকে সত্যিকার অর্থে গ্রহণ করা এক বিষয় নয়।
হয়তো আমরা ভালোবাসাকে ভুল জায়গায় খুঁজছি। আমরা ভাবি, সমস্যাটি সঠিক মানুষটিকে খুঁজে পাওয়ার। পৃথিবীতে কোথাও একজন মানুষ আছেন, যিনি আমাদের জন্য তৈরি। তাকে খুঁজে পেলেই সব সহজ হয়ে যাবে। যেন ভালোবাসা একটি তালা, আর মানুষটি তার উপযুক্ত চাবি। কিন্তু চাবি পেয়ে গেলেই কি দরজা খুলে যায়? দরজার ওপারে প্রবেশ করার সাহস, সেখানে থাকার ধৈর্য, ঘরটিকে চিনে নেওয়ার সময়—এসবেরও তো প্রয়োজন আছে। একসময় অনেক সমাজে বিয়ে নির্ধারিত হতো পরিবার, অর্থনীতি, সামাজিক অবস্থান ও প্রচলিত রীতির ভিত্তিতে। ভালোবাসা ছিল কি না, তা সব সময় প্রধান প্রশ্ন ছিল না। পরে রোমান্টিক ভালোবাসা বিয়ের কেন্দ্রে চলে এল। মানুষ ভাবতে শুরু করল, যার প্রেমে পড়েছি, তাকেই বিয়ে করা উচিত। এই পরিবর্তন মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু এর সঙ্গে একটি ধারণাও শক্তিশালী হলো: ভালোবাসার সাফল্য নির্ভর করে সঠিক মানুষটিকে খুঁজে পাওয়ার ওপর। আমরা তখন ভালোবাসার ক্ষমতা গড়ে তোলার চেয়ে ভালোবাসার উপযুক্ত বস্তু খুঁজতেই বেশি মনোযোগী হলাম। মানুষের সমাজ বদলেছে। মানুষের পছন্দও বদলেছে। কিন্তু ভালোবাসা নিয়ে আমাদের বিভ্রান্তি রয়ে গেছে।
আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে প্রায় সবকিছুরই বাজারমূল্য আছে। মানুষও যেন সেই বাজারের বাইরে নয়। আমরা নিজেদের উপস্থাপন করি, নিজের গুণাবলি তুলে ধরি, অন্যের গুণাবলি যাচাই করি। কে কতটা সফল, কে কতটা সুন্দর, কার ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল—এসব প্রশ্ন আমাদের পছন্দকে প্রভাবিত করে। সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আমরা অনেক সময় অদৃশ্য এক হিসাবের খাতা খুলে বসি। আমি কী দিতে পারি? অন্যজন আমাকে কী দিতে পারবে? এই বিনিময়ে আমার লাভ কতখানি? এমন সমাজে আকর্ষণীয় হওয়ার অর্থও স্থির থাকে না। যে সৌন্দর্য আজ মূল্যবান, কাল তা পুরোনো হয়ে যেতে পারে। যে ব্যক্তিত্ব আজ সবার মন জয় করে, কাল সে হয়তো আর ফ্যাশনের সঙ্গে মেলে না। মানুষ নিজেকেও তখন একটি পণ্যের মতো দেখতে শেখে—যার মূল্য নির্ভর করে অন্যেরা তাকে কতটা চায় তার ওপর। কিন্তু ভালোবাসা কি সত্যিই এমন কোনো বিনিময়, যেখানে দুজন মানুষ নিজেদের মূল্য যাচাই করে তারপর একে অন্যকে বেছে নেয়? সম্ভবত এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল। আমরা ভালোবাসাকে এমনভাবে কল্পনা করি, যেন এটি একটি সফল কেনাকাটা। অথচ একজন মানুষকে ভালোবাসা মানে কেবল তার মধ্যে নিজের চাহিদার উপযুক্ত বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া নয়। মানুষটি আমাদের প্রত্যাশার বাইরে কী, তার ভয় কোথায়, তার নীরবতার অর্থ কী—এসবের দিকে তাকানোরও নাম ভালোবাসা। তবু আমরা প্রায়ই অন্য কিছু দিয়ে ভালোবাসার শুরুটিকে চিনে নিই।
কারও সঙ্গে প্রথম দেখা। হঠাৎ মনে হলো, এত দিন ধরে যেন এই মানুষটিরই অপেক্ষা করছিলাম। কথার পর কথা, চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা, একে অন্যের কাছে নিজের গোপন কথাগুলো খুলে বলা। মনে হয়, আমাদের মধ্যকার দূরত্ব আর নেই। দুটি আলাদা জীবন যেন এক হয়ে গেল। এই অনুভূতি মিথ্যা নয়। কিন্তু একে সম্পূর্ণ ভালোবাসা ভেবে নেওয়া ভুল হতে পারে। কখনো কখনো অন্য একজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার আনন্দ আসলে আমাদের একাকিত্ব থেকে সাময়িক মুক্তি। এত দিন যে দূরত্ব আমাদের ঘিরে রেখেছিল, তা হঠাৎ ভেঙে যায়। মনে হয়, অবশেষে কেউ আমাদের বুঝেছে। পৃথিবীতে আর কোনো দেয়াল নেই।
কিন্তু সময় যায়। পরিচিতি বাড়ে। যে মানুষটিকে রহস্যময় মনে হয়েছিল, তার অভ্যাসগুলো চেনা হয়ে ওঠে। যে কথাগুলো একসময় নতুন ছিল, সেগুলো পুনরাবৃত্তি হতে থাকে। মতের অমিল দেখা দেয়। প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার সংঘর্ষ হয়। আমরা আবিষ্কার করি, অন্য মানুষটি আমাদের কল্পনার তৈরি চরিত্র নন। তাঁর নিজস্ব ইচ্ছা আছে, সীমাবদ্ধতা আছে, এমন কিছু দিক আছে যা আমরা বদলে দিতে পারব না। তখন প্রাথমিক উত্তেজনা কমে আসে। আমরা ভাবতে শুরু করি, ভালোবাসা কি ফুরিয়ে গেল? হয়তো ভালোবাসা ফুরোয়নি। হয়তো আমরা যে অনুভূতিটিকে ভালোবাসা বলে চিনেছিলাম, তার একটি অংশ ছিল নতুনত্বের আনন্দ, একাকিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার স্বস্তি। সম্পর্কের শুরুতে যে ঘনিষ্ঠতা সহজে আসে, তাকে দীর্ঘদিন ধরে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অন্য ধরনের শ্রম প্রয়োজন।
এখানেই ভালোবাসার শিল্পের প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে। আমরা প্রায়ই বলি, ভালোবাসা কঠিন। কেউ বলে, ভালোবাসা মানুষকে অন্ধ করে। কেউ বলে, ভালোবাসার কোনো ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু ভালোবাসা কঠিন বলেই কি তাকে বোঝার চেষ্টা ছেড়ে দিতে হবে? যে জিনিস আমাদের জীবনের এতখানি জায়গা জুড়ে থাকে, তার ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান না করে কি আমরা বেঁচে থাকতে পারি? ভালোবাসায় ব্যর্থ হওয়ার অভিজ্ঞতা প্রায় সবারই আছে। কখনো সম্পর্ক ভেঙে যায়। কখনো মানুষ পাশাপাশি থেকেও পরস্পরের কাছে পৌঁছাতে পারে না। কখনো আমরা কাউকে ভালোবাসি বলে দাবি করি, অথচ তার স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারি না। কখনো ভালোবাসার নামে অধিকার প্রতিষ্ঠা করি, কখনো নিজের ভয়কে অন্য মানুষের ওপর চাপিয়ে দিই। এসবের পরও আমরা ভালোবাসা চাই। কারণ ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষাকে সহজে ত্যাগ করা যায় না। আমরা একা থাকতে পারি, কিন্তু একাকিত্বের সঙ্গে চিরকাল সন্ধি করতে পারি না। আমরা সম্পর্ক থেকে পালিয়ে যাই, আবার কোনো একদিন অন্য একটি সম্পর্কের দিকে হাত বাড়াই। তাই প্রশ্নটি শুধু এই নয়, কেন আমাদের ভালোবাসা ব্যর্থ হয়। প্রশ্ন হলো, ভালোবাসতে শেখার জন্য আমরা কী করেছি?
যে কোনো শিল্প শেখার কয়েকটি ধাপ আছে। প্রথমে তার প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে হয়। তারপর সেই জ্ঞানকে অনুশীলনের মধ্য দিয়ে নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে হয়। দীর্ঘ অনুশীলনের পরে এমন একটি সময় আসে, যখন শেখা আর আলাদা কোনো কাজ থাকে না; তা আমাদের স্বভাবের অংশ হয়ে ওঠে। তখন শিল্পী কেবল নিয়ম মেনে কাজ করেন না, তিনি কাজটির ভেতরে বাস করতে শেখেন। ভালোবাসার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয়। শুধু ভালোবাসা সম্পর্কে পড়ে, কথা বলে কিংবা তার সৌন্দর্য কল্পনা করে ভালোবাসতে শেখা যায় না। জানতে হয়, তারপর সেই জানাকে প্রতিদিনের আচরণে রূপ দিতে হয়। অন্য মানুষের কথা শোনার মধ্যে, নিজের অহংকারকে প্রশ্ন করার মধ্যে, ভুল স্বীকার করার মধ্যে, সম্পর্কের কঠিন সময়েও মনোযোগ ধরে রাখার মধ্যে এই অনুশীলন ঘটে।
কিন্তু শিল্প শেখার জন্য সময় দেওয়া দরকার। আর সময় দেওয়া মানে কোনো কিছুকে গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকার করা।আমাদের জীবনে সাফল্য, অর্থ, মর্যাদা ও ক্ষমতার জন্য সময়ের অভাব হয় না। এসব অর্জনের জন্য আমরা দীর্ঘদিন পরিশ্রম করতে পারি, ব্যর্থতার পর আবার শুরু করতে পারি, নিজেদের বদলে নিতে পারি। অথচ ভালোবাসার প্রশ্ন এলে আমরা প্রায়ই চাই, কোনো পরিশ্রম ছাড়াই সবকিছু সুন্দর হয়ে উঠুক। আমরা ভালোবাসাকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি বলে মনে করি, কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবনে তাকে সেই গুরুত্ব দিই না। ভালোবাসার কথা বলি, অথচ তার জন্য প্রয়োজনীয় মনোযোগ অন্যত্র ব্যয় করি। এখানে কোনো সহজ সমাধান নেই। ভালোবাসা শেখার জন্য কোনো চূড়ান্ত সূত্রও নেই, যা একবার মুখস্থ করে নিলে আর ভুল হবে না। কিন্তু শুরু করার একটি পথ আছে: ভালোবাসাকে কেবল একটি অনুভূতি হিসেবে না দেখে মানুষের একটি ক্ষমতা হিসেবে ভাবা। এমন একটি ক্ষমতা, যা জ্ঞান, অনুশীলন, ধৈর্য ও আত্মপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়।তখন প্রশ্নটি আর থাকে না—কীভাবে এমন একজন মানুষকে খুঁজে পাব, যিনি আমাকে ভালোবাসবেন? প্রশ্নটি বদলে যায়।আমি কীভাবে এমন একজন মানুষ হয়ে উঠব, যিনি অন্যকে ভালোবাসতে পারেন?
এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো ভালোবাসার প্রথম পাঠ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









