ভ্রমণ মানুষের মনে আনন্দ জাগায়, স্বজনদের সঙ্গে তৈরি করে স্মরণীয় মুহূর্ত। অথচ সেই আনন্দভ্রমণই যদি মৃত্যুর বিভীষিকায় শেষ হয়, তার চেয়ে মর্মান্তিক আর কী হতে পারে! কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের প্রাণহানি শুধু একটি দুর্ঘটনার শোকাবহ পরিণতি নয়; এটি পর্যটনকেন্দ্রের অগ্নিনিরাপত্তা, প্রশাসনিক নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের আটজন রয়েছেন বলে জানা গেছে। স্বজনদের সঙ্গে সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে গিয়ে এমন করুণ পরিণতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যে স্থান মানুষের প্রশান্তি ও আনন্দের উপলক্ষ হওয়ার কথা, নিরাপত্তার অভাবে সেটিই যখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়, তখন পর্যটন খাতের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় কাঠের তৈরি তিনতলা রিসোর্টটিতে শনিবার সকালে আগুন লাগে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। এ ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। নিহতদের পরিচয় শনাক্তের কাজও চলেছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টে ঠিক কতজন অবস্থান করছিলেন, কতজন নিরাপদে বের হতে পেরেছেন এবং কেউ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন কি না, সেসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নিশ্চিত করা জরুরি। শোকাহত পরিবারগুলোর কাছে প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই উদ্ধার, শনাক্তকরণ ও তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও মানবিকতার পরিচয় দিতে হবে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকের বক্তব্য অনুযায়ী, রিসোর্টটির প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছিল না। গত জুনে পরিদর্শনের সময় প্রতিষ্ঠানটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে সতর্ক করে নোটিশও দেওয়া হয়েছিল। এরপরও যদি রিসোর্টটির কার্যক্রম চলতে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—ঝুঁকি শনাক্ত হওয়ার পর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? শুধু সতর্কতামূলক নোটিশ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ আছে কি? কোনো প্রতিষ্ঠান মানুষের জীবন বিপন্ন করতে পারে, এমন ঝুঁকিতে পরিচালিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব কেবল অবহিত করা নয়; আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াও।
অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে হয়ে থাকতে পারে বলে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ধারণা করা হয়েছে। এসি ও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কথাও বলা হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে আগুনের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়। পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটিকে এ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে। বৈদ্যুতিক সংযোগ, গ্যাস সিলিন্ডারের নিরাপদ ব্যবহার, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি বহির্গমন পথ, ভবনের নির্মাণসামগ্রী এবং অনুমোদনসংক্রান্ত নথি—সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ হলেও প্রতিবেদনের মান ও সুপারিশের বাস্তবায়ন যেন কোনোভাবেই উপেক্ষিত না হয়।
এ ঘটনায় রিসোর্টের ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কিন্তু একজনকে গ্রেপ্তার করাই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি সম্পর্কে কারা অবগত ছিলেন, সতর্কবার্তার পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা ছিল কি না—তা খতিয়ে দেখতে হবে। তদন্তে অপরাধ বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে তদন্তের নামে যেন নিরপরাধ কাউকে দায়ী করা না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
কক্সবাজার দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিবছর দেশ-বিদেশের বিপুলসংখ্যক পর্যটক এখানে আসেন। কিন্তু পর্যটন অবকাঠামোর সম্প্রসারণের সঙ্গে নিরাপত্তাব্যবস্থার সমান অগ্রগতি না হলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা আবারও ঘটতে পারে। বিশেষ করে কাঠ ও অন্যান্য দাহ্য উপকরণে নির্মিত হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁয় অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ মহড়া এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে। নিয়মিত পরিদর্শনের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।
১০টি প্রাণের বিনিময়ে যে কঠিন শিক্ষা সামনে এসেছে, তা যেন সময়ের সঙ্গে বিস্মৃত না হয়। নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করি। একই সঙ্গে দাবি জানাই, অগ্নিকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক। পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন মানে শুধু নতুন স্থাপনা নির্মাণ কিংবা পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়; এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ রাখা যাচ্ছে, তার ওপর। আর কোনো পরিবারকে যেন আনন্দভ্রমণে গিয়ে প্রিয়জনের নিথর দেহ নিয়ে ফিরতে না হয়। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হোক সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের প্রধান অঙ্গীকার।
এই মর্মান্তিক ক্ষতি যেন আরেকটি তদন্ত প্রতিবেদন আর কিছুদিনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থাকে। নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এখন জরুরি। মানুষের জীবন রক্ষায় অবহেলার কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্বে ব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









