বাংলার ঋতুচক্রে শরৎ আসে প্রকৃতির নবজাগরণ, শস্যের সম্ভাবনা ও মানুষের হৃদয়ে উৎসবের আনন্দ নিয়ে। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মাঠের ধারে কাশফুলের দোলা, ভোরের বাতাসে শিউলির সুবাস আর মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাকের বাদ্য মিলেমিশে গড়ে তোলে শারদীয় দুর্গোৎসবের আবহ। ধর্মীয় আবেগের গণ্ডি পেরিয়ে এ উৎসব হয়ে ওঠে শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, পারিবারিক স্মৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির মিলনমেলা।
জীবনানন্দ দাশের পঙ্ক্তি, “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর”, বাংলার প্রকৃতির প্রতি এই গভীর অনুরাগকে আরও মূর্ত করে তোলে। তবে উৎসবের এই আনন্দের মাঝেও প্রশ্ন জাগে, দেবীকে আমরা বাইরে আরাধনা করি, তাঁর শক্তি, সাহস ও শুভবোধ কি আমাদের অন্তরেও জাগ্রত হয়? মণ্ডপের প্রতিমা দৃশ্যমান দুর্গার প্রতীক, আর মানুষের বিবেক, মমতা, সত্যনিষ্ঠা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তিই অন্তরের দুর্গা।
মহিষাসুরমর্দিনী রূপে দেবী অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয় ঘোষণা করেন, উমার পিতৃগৃহে আগমন জাগিয়ে তোলে মায়ের ঘরে ফেরার চিরন্তন আবেগ, আর বিসর্জন স্মরণ করিয়ে দেয় জীবনের মিলন, বিচ্ছেদ ও অনিত্যতার কথা। তাই দুর্গোৎসব কেবল দেবীর আরাধনা নয়, নিজের অন্তরকে নতুন করে আবিষ্কার এবং মানবিক মূল্যবোধে জীবনকে সমৃদ্ধ করারও এক অনন্য উপলক্ষ।
দেবীর আরাধনার প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে নিজের অন্তরের দিকে তাকাতে হয়। মানুষ সাফল্য, সম্পদ, সম্মান ও সুখের সন্ধানে বাইরে ছুটে বেড়ালেও আত্মঅনুসন্ধানের সুযোগ পায় খুব কম। রবীন্দ্রনাথের “আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে, দেখতে আমি পাইনি তোমায়” এবং “বাহির পানে চোখ মেলেছি, আমার হৃদয় পানে চাই নি” পঙ্ক্তিতে এই আত্মবিস্মৃতির কথাই প্রকাশ পেয়েছে। মানুষের ভয়, লোভ, হিংসা, অহংকার ও সংকীর্ণতাই যেন অন্তরের মহিষাসুর। তাকে পরাজিত করার সংগ্রাম শুরু করতে হয় নিজের ভেতর থেকেই।
রবীন্দ্রনাথের প্রার্থনা, “আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধূলার তলে। সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে”, অহংকারমুক্ত হয়ে বৃহত্তর সত্য ও কল্যাণের কাছে নিজেকে সমর্পণের শিক্ষা দেয়। দেবীর চরণে ফুল দেওয়ার পাশাপাশি নিজের অশুভ প্রবৃত্তি বিসর্জনের অঙ্গীকারই পূজাকে অর্থবহ করে। বাইরে ভক্তি আর অন্তরে বিদ্বেষ, কিংবা আরাধনার পাশাপাশি আচরণে অন্যায় বজায় থাকলে পূজার মূল উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যায়।
রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতা মানুষের জীবন, প্রকৃতি, শ্রম ও ভালোবাসার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাঁর “সীমার মাঝে, অসীম, তুমি” উচ্চারণে সীমাবদ্ধ জীবনের মধ্যেই অসীমের উপস্থিতি অনুভূত হয়। “আনন্দধারা বহিছে ভুবনে” গানে ধ্বনিত হয় বিশ্বপ্রকৃতির প্রাণস্পন্দন। তাঁর কাছে আধ্যাত্মিকতা জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো উপলব্ধি নয়; মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং সৃষ্টির সৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে সত্যকে অনুভব করার পথ। দেবী দুর্গার মধ্যেও এই মানবিক দর্শনের প্রকাশ ঘটে।
তিনি একদিকে স্নেহময়ী কন্যা উমা, অন্যদিকে অন্যায় ও অশুভের বিরুদ্ধে সংগ্রামী শক্তি। তাঁর মাতৃরূপ মমতার, আর দশভুজা রূপ সাহস ও দায়িত্ববোধের প্রতীক। সেই অর্থে দুর্গোৎসবের আলো কেবল প্রদীপের উজ্জ্বলতা নয়। তা অজ্ঞতার পরিবর্তে জ্ঞান, ভয়ের পরিবর্তে সাহস, বিদ্বেষের পরিবর্তে ভালোবাসা এবং আত্মকেন্দ্রিকতার পরিবর্তে মানবিকতার আলো। এই আলো যখন মানুষের চিন্তা ও আচরণে প্রতিফলিত হয়, তখনই দেবীর প্রতীকী শক্তি জীবন্ত হয়ে ওঠে।
অন্তরের আলো শুধু অনুভূতির বিষয় নয়, কর্মের মধ্য দিয়ে তার প্রকাশ ঘটাতে হয়। রবীন্দ্রনাথের জীবন ও কর্মে এই উপলব্ধির বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়। শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা, শ্রীনিকেতনের গ্রামোন্নয়ন, শিক্ষায় নতুন চিন্তার প্রয়োগ এবং কৃষি ও কারুশিল্পের প্রসারে তাঁর উদ্যোগ মানুষের সৃজনশীল বিকাশের প্রতি অঙ্গীকারের পরিচয় বহন করে। তাঁর “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে” গানটি ১৯০৫ সালের স্বদেশী যুগে রচিত। গানটি গীতার কোনো বাণীর অনুবাদ নয়, তবে বাধা ও একাকিত্ব সত্ত্বেও সত্য ও কর্তব্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার যে নৈতিক সাহস এতে প্রকাশ পেয়েছে, তার সঙ্গে কর্মনিষ্ঠার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
দুর্গোৎসবের আয়োজনেও এমন কর্মচেতনার পরিচয় মেলে। মৃৎশিল্পী প্রতিমা গড়েন, কারিগর তাকে রূপ দেন, রংশিল্পী সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলেন, ঢাকি বাদ্যে উৎসবের স্পন্দন জাগান, আলোকশিল্পী মণ্ডপ সাজান এবং স্বেচ্ছাসেবকেরা নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষা করেন। তাঁদের সম্মিলিত শ্রমেই উৎসব পূর্ণতা পায়। ফলে দুর্গোৎসব শুধু ভক্তির প্রকাশ নয়, মানুষের শ্রম, সহযোগিতা ও সম্মিলিত সৃষ্টিশীলতারও উৎসব।
উমার আগমন ও বিদায়ের আবেগ দুর্গোৎসবকে বাঙালির হৃদয়ে বিশেষ স্থান দিয়েছে। কয়েক দিনের আনন্দ শেষে দেবী ফিরে যান কৈলাসে। রবীন্দ্রনাথের “যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়” পঙ্ক্তিতে অনিবার্য বিচ্ছেদের যে বেদনা প্রকাশ পেয়েছে, বিসর্জনের মুহূর্তে বাঙালি যেন তারই প্রতিধ্বনি অনুভব করে। প্রতিমা বিদায় নেয়, কিন্তু থেকে যায় স্মৃতি, ভালোবাসা ও পুনরাগমনের প্রত্যাশা। এই বিদায় শেখায়, দৃশ্যমান উপস্থিতি ক্ষণস্থায়ী হলেও তার রেখে যাওয়া শিক্ষা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাই বিসর্জনের পর বাইরের প্রতিমা বিদায় নিলেও অন্তরের দুর্গাকে বিসর্জন দেওয়া যায় না।
বরং তাঁর সাহস, মমতা ও শুভবোধ জীবনে ধারণ করার দায়িত্ব তখনই শুরু হয়। দুর্গোৎসবের আরেকটি বড় শক্তি তার সামাজিক সম্প্রীতি। পূজামণ্ডপে ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও শুভেচ্ছা, প্রসাদ, সৌজন্য ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিজয়ার প্রণাম ও আলিঙ্গন মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নবায়নের প্রতীক। কাজী নজরুল ইসলামের পঙ্ক্তি, “মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান”, এই সম্প্রীতির চেতনাকেই ধারণ করে। রবীন্দ্রনাথের “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির” কবিতায় ভয়, সংকীর্ণতা ও বিভাজনমুক্ত সমাজের যে স্বপ্ন ফুটে উঠেছে, দুর্গোৎসবের সর্বজনীন আনন্দেও তার প্রতিফলন ঘটতে পারে। ধর্ম মানুষের হৃদয়কে সংকুচিত না করে প্রসারিত করলেই উৎসব পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির শক্তিতে পরিণত হয়।
দুর্গোৎসবের অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো নিজের ভেতরের অশুভকে চিনে তাকে পরাজিত করা, অন্যের প্রতি মমতা গড়ে তোলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে দাঁড়ানো, কর্তব্যনিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা এবং বিভাজনের বদলে সম্প্রীতি ও ভালোবাসার সেতু নির্মাণ করা। দেবীর সামনে মাথা নত করে মানুষের প্রতি অন্যায় করা, প্রদীপ জ্বালিয়ে অন্যের জীবনে অন্ধকার তৈরি করা কিংবা ধর্মের নামে কাউকে ছোট করা তাঁর আরাধনার মূল চেতনার পরিপন্থী।
রবীন্দ্রনাথের রচনার অন্তর্নিহিত সুরে যে আত্মজাগরণ, বিনয়, নৈতিক সাহস ও মুক্ত মানবতার আকাঙ্ক্ষা ধ্বনিত হয়েছে, তা আমাদের জীবনেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। কাজী নজরুল ইসলামের “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান” পঙ্ক্তিটি স্মরণ করিয়ে দেয়, ধর্ম, বর্ণ ও পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষের মর্যাদা এবং মানবতাই সর্বাগ্রে। তাই প্রশ্ন জাগে, বাইরে মাটির দুর্গা গড়ি, ভেতরে কি গড়ে তুলি আলোর মানুষ? মণ্ডপ আলোকিত করি, আমাদের বিবেকও কি তেমনি আলোকিত হয়? দেবীর বিজয় উদ্যাপন করি, অথচ নিজের লোভ, অহংকার, ভয় ও হিংসার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারি কি? এই আত্মজিজ্ঞাসার মধ্যেই দুর্গোৎসবের প্রকৃত তাৎপর্য ও সার্থকতা নিহিত।
বিসর্জনের পর মণ্ডপ খালি হয়, ঢাকের বাদ্য থেমে যায়, উৎসবের আলোও ধীরে ধীরে নিভে আসে। কিন্তু দেবীর আরাধনা কি সেখানেই শেষ হয়ে যায়? যদি নিজের লোভ, অহংকার, হিংসা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারি, যদি মানুষের দুঃখে হৃদয় না কাঁদে, অসহায় ও দুর্বলের পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে না পারি, তবে প্রতিমার সামনে আমাদের প্রণাম, অঞ্জলি ও ভক্তি কি সত্যিই সার্থক? মনে রাখতে হবে, অশুভের বিরুদ্ধে দেবীর বিজয় কেবল মণ্ডপে উদ্যাপনের বিষয় নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনে তা অর্জনের এক অবিরাম অঙ্গীকার।
তাই এবার শুধু প্রতিমা বিসর্জন নয়, বিসর্জন দিই নিজেদের ভেতরে জমে থাকা হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার ও অমানবিকতাকে। দেবীকে বিদায় দেওয়ার আগে জাগিয়ে তুলি অন্তরের বিবেক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সাহস এবং মানুষের প্রতি নিঃশর্ত মমতা। কারণ দুর্গোৎসবের প্রকৃত বিজয়া তখনই, যখন মহিষাসুরের প্রতীকী পরাজয়ের পাশাপাশি আমাদের অন্তরের অশুভও পরাজিত হয়, আর প্রতিমার আলো ছড়িয়ে পড়ে মানুষের চিন্তা, আচরণ ও কর্মে, রূপ নেয় মানবতার চিরন্তন আলোয়।
লেখক: কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক ও উপদেষ্টা, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি, ঢাকা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









